চামড়ার বাজারে তামাশা দায় এড়াতে পারে না সরকার


চামড়া

বাংলাদেশে এ বছর পশুর কাঁচা চামড়ার দাম গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু চামড়ার এতোটা দাম কমলেও জুতা, স্যান্ডেল, ব্যাগের মতো চামড়া জাত পণ্যের মূল্য এখনো চড়া রয়েছে, তার দাম কমার কোন লক্ষণ দেখা যায়নি। কেন কাঁচামালের দরপতনের পরেও এসব পণ্যের এতো চড়া দাম?

আমরা বাংলাদেশিরা দেশে তৈরি চামড়ার পণ্য ব্যবহার করতেই পছন্দ করি। কিন্তু যেখানে কোরবানির চামড়া প্রায় পানির দরেই বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি তখনো দোকান থেকে চামড়ার পণ্য কিনতে হচ্ছে কয়েকগুণ বেশি দাম দিয়ে। অথচ কোরবানির গরুর চামড়া বিক্রি করতে হয় মাত্র তিনশো টাকায়। এর বেশি কেউ দাম দেয় না। কিন্তু এর আগে যখন দোকান থেকে জুতা-স্যান্ডেল কিনেছি, কোনটাই চার-পাঁচ হাজার টাকার নিচে কিনতে পারিনি। এখনো পারছি না। তাহলে এতো সস্তায় চামড়া কিনে, সেটা দিয়ে জিনিসপত্র বানিয়ে এতো বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে কেন? একজন ক্রেতা হিসাবে আমার তো মনে হচ্ছে আমি বৈষম্যের শিকার হচ্ছি। দেশে বর্তমানে ভালো একটি দোকানে চামড়া দিয়ে তৈরি একজোড়া জুতার দাম তিন থেকে আট হাজার টাকা।

প্রতি বছরই কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে ধস নামে, এবারো ব্যতিক্রম নয়। সারাদেশে প্রায় একই পরিস্থিতি। এক লাখ টাকা দামের গরুর চামড়া ৫০০ টাকায়ও বিক্রি হয়নি। অথচ ৮/১০ বছর আগে ৫০ হাজার টাকা দামের গরুর চামড়াই কেনাবেচা হতো ২ থেকে ৩ হাজার টাকায়।

তবে ঈদের আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে সরকার চামড়ার দাম আগেরবারের চেয়েও কম নির্ধারণ করে দিয়েছিল। অথচ কোরবানির পর এমন হয়েছে যে সেই দরও ঠিক থাকেনি। অর্থাৎ কোরবানির পশুর চামড়া কেনাবেচা হয়েছে সরকার-নির্ধারিত দরের চেয়েও অনেক কমে।

কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে সারাদেশে কয়েক লাখ মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়ার ব্যবসায় নামেন। কয়েক হাজার পাইকারি ব্যবসায়ী তাঁদের কাছ থেকে চামড়া কিনে জমা রাখেন আড়তদারদের কাছে। এবারের ঈদে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা থেকে কম দামে চামড়া কিনেছে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।

গত ৩১ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কমদামে বিক্রি হচ্ছে পশুর চামড়া। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ৮০ হাজার টাকার গরুর চামড়ার দাম দিচ্ছেন ২শ টাকারও কম। এক লাখ টাকার গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে ৩শ টাকা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া কেনার লোক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে, রাজধানীর মাদ্রাসা ও এতিমখানার লোকজন বিনা পয়সায় কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করছে।

রাজধানীর বাইরে সবচেয়ে ভালো মানের কাঁচা চামড়া বিক্রি হচ্ছে ৫শ টাকায়। আর মাঝারি মানের চামড়া বিক্রি হচ্ছে ৩শ থেকে ৪শ টাকার মধ্যে। যা গত বছরও ৭শ থেকে ৮শ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। সরকারের নির্ধারণ করে দেওয়া দাম অনুযায়ী, ঢাকায় কোরবানির গরুর প্রতিটি ২০ থেকে ৩৫ বর্গফুট চামড়া লবণ দেওয়ার পরে ৯০০ থেকে ১ হাজার ৭৫০ টাকায় কেনার কথা ট্যানারি মালিকদের। কিন্তু এবার ফড়িয়া বা মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের দেখা মিলছে না। কোথাও কোথাও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় চামড়া কিনেছে।

আর রাজধানীর বাইরে দেশের অন্যান্য স্থানে চামড়া বেচা-কেনা হচ্ছে আরও কম দামে। এবার চামড়ার দামে মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে। উলটো দিকে দেখেন দিন দিন চামড়া ব্যবহৃত জিনিস পত্রের দাম আকাশ চুম্বি। চামড়া ব্যবহৃত জিনিস পত্রের কদর বেড়েছে বাড়েনি কেবল চামড়ার দাম। এর পেছনে একটি শক্ত সিন্ডিকেট ও সরকারের দায়িত্বশীল ব্যাক্তিদের গাফিলতিই প্রধান কারণ। এছাড়া চামড়ার বাজারে তামাশা দায় এড়াতে পারে না সরকার। অনতিবিলম্বে চামড়ার ন্যায্য দাম নির্ধারিত করে এ শিল্পকে বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।