জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌপথে ইউরোপ পাড়ি আর নয়


আব্দুল্লাহ আল শাহীন

গতকাল ১২ মে বিকেলবেলা স্বাভাবিক নিয়মে ফেসবুকের টাইমলাইনে বিভিন্ন পোস্ট পড়ছিলাম। একটি পোস্ট এলাকার ভাই বন্ধুদের প্রায় সবারই টাইমলাইনে ছিল। সেই পোস্ট ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত, মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। সিলেটের গোলাপগঞ্জের দুই গ্রামের কমরান আহমদ মারুফ ও আফজাল হোসেন নামের দুই তরুণ লিবিয়া হতে ইতালি সাগরপথে যেতে চাইলে ভূমধ্যসাগরে তাদের ট্রলার ডুবে যায় এবং এই দুই যুবক ইন্তেকাল করেন। কামরান আহমদ মারুফের বড় ভাই কোনরকম বেচে গেলেও বড় বোনের দেবর মৃত্যুবরণ করেন। এতো ছিল নিজ এলাকার সংবাদ। পাশের উপজেলা তথা ফেঞ্চুগঞ্জের চার যুবক সহ একইসাথে ভূমধ্যসাগরে তিউনিসিয়ার উপকূলে নৌকাডুবিতে ৩৭ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচার হচ্ছে। ট্রলারে মোট ৫১ জন বাংলাদেশি সহ অভিবাসী ইতালি যাওর উদ্দেশ্যে লিবিয়া ছাড়েন। গণমাধ্যম লিবিয়ার ত্রিপলির বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্যের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে এসব সংবাদ প্রচার হচ্ছে।

বিদেশ গমনেচ্ছু যুবকদের পরিসংখ্যার সিংহভাগ সিলেটের। এর অন্যতম কারণ বর্তমান সামাজ ব্যবস্থা। শিক্ষিত অশিক্ষিত সকল শ্রেণির যুবকরাই আর্থিক উন্নতির স্বপ্নে বিভোর। বলা বাহুল্য সিলেটের প্রতিটি যুবকদের মধ্যে ইউরোপ যাওয়ার প্রবণতা কাজ করে। যুবকরা ইউরোপ যাওয়ার জন্য বছরের পর বছর বেকারত্ব মেনে নেয়। ইউরোপ যাওয়ার জন্য অগ্রিম ১ -২ লাখ টাকা দিতে আগ্রহী। প্রায় ১০ বছর থেকেই অগ্রিম টাকা দিয়ে রেখেছেন অথচ ভিসা হচ্ছেনা এরকম হাজারো যুবক রয়েছে। আমার দেখা এমন কিছু যুবক আছে যারা ইউরোপ যাওয়ার জন্য ১৪/১৫ লাখ টাকা দালালের খপ্পরে পড়ে খুইয়েছেন। আবার অনেকে আছেন ইউরোপ গিয়ে ৫ বছর থেকে দেশে এক টাকাও পাঠাতে পারছেন না।

সিলেটের যুবকরা মনে করে ইউরোপ যেতে পারলেই নিজের সামাজিক ও আর্থিক অবস্থানের পরিবর্তন হবে। এমনটা ভাবার কারণ বর্তমান সামজে টাকা ছাড়া মূল্যায়ন পাওয়া যায় না। সমাজের অনেকের কাছেই ভালো কাজের মূল্যায়ন নেউ যদি না ইউরোপের বাসিন্দা হয়। সেজন্য অধিকাংশ যুবক পড়া লিখা করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেয়ে মনের মধ্যে ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন লালন করে। কিন্তু এই স্বপ্ন দেখার ফলে জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করে দিচ্ছে। ইউরোপের আশায় ৫/১০ বছর বেকারত্ব নিয়ে সময় কাটাতে হয়। অনেকে আবার ইউরোপ যেতে না পেরে আজীবন বেকার হিসেবেই কাটিয়ে দিচ্ছে। অনেকে আবার লক্ষ লক্ষ টাকা নষ্ট করছে। তবে এটা সত্য যে, বহুসংখ্যক ইউরোপ প্রবাসী যুবকরা সামাজিক ও আর্থিক ভাবে সফল।

বর্তমান সময়ে ইউরোপ যাওয়ার জন্য জীবনের ঝুঁকি নেওয়া হচ্ছে। আমরা মিডিয়া মাধ্যম দেখতে পাচ্ছি এসব ঝুঁকিপূর্ণ পথের কথা। ইউরোপ যাওয়ার পথে নিখোঁজ ও প্রাণহীনর খবর শুনছি। ট্রলার ডুবে মৃত্যুর কথা শুনছি। গত কয়েকদিন পূর্বে সুদান থেকে নতুন এক সহকর্মী এসেছেন। সালাম বিনময়ের পর আমার দেশ জানতে চাইলেন। বাংলাদেশ বলার পর আবার প্রশ্ন করলেন জেলার নাম। সিলেট শুনে কাছে এসে চুপিচুপি যা বললেন তা শুনে বুকের মধ্যে প্রচণ্ড এক ব্যথা অনুভব করলাম।

উনি জানালেন বাংলাদেশের হাজারো যুবক ইউরোপ যাওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশ হয়ে সুদানে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে আর তাদের মধ্যে অধিকাংশই সিলেটী। আরো জানালেন সুদান যাওয়ার পূর্বে এবং সুদান থেকে অন্য দেশে যাওয়ার পথে বাংলাদেশের মানবসম্পদ যুবকরা মানব প্রাচারকারীর গুলিতে প্রাণ দিচ্ছে, মরুভূমিতে পানির অভাবে মারা যাচ্ছে। শুধু তাই নয় বিভিন্ন দেশের বর্ডারে নাকি নিরাপত্তা কর্মীদের হাতেও জীবন দিচ্ছে। এক দালাল আরেক দালালের কছে এদের বিক্রি করছে। এসব দালালরা বাংলাদেশে ফোন করে মুক্তিপণ হিসেবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এসব ঘৃণিত কর্মকাণ্ড ও হত্যার সাথে অনেক বাংলাদেশি জড়িত।

মানুষরূপী দালালরা বলে কোনরকম ঝুঁকি ছাড়া ইতালি পৌছে দেব। আর আমরা সব বুঝলেও দালালদের দালালি বুঝি না। দালালদের খপ্পরে পড়ে ঘরের টগবগে যুবকটাকে ঝুকিপূর্ণ রাস্তায় ইউরোপ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেই। একে একে বহু প্রাণ গেছে। কেউ সাগরে, কেউ জঙ্গলে, কেউ আবার মরুভূমিতে।
দয়া করে এবার আর কোন দালালকে প্রশ্রয় দেবেন না। দয়া করে আর কোন যুবককে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবেন না। দেশ ও প্রবাসের বাংলাদেশি দালালদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করা সময়ের দাবি।

বর্তমান বিশ্বের কোথাও আগের মত সুযোগ সুবিধা নেই। তাই বলছি ১০ লক্ষ টাকা দিয়ে দেশে ছোটখাটো ব্যবসা চালু করার কথা চিন্তা করুন। সেক্ষেত্রে পারিবারিক সচেতনতা ও রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবার থেকে ব্যবসা চালুর জন্য যুবকের আগ্রহ জাগাতে হবে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে যুব সমাজকে কর্মমুখী করার প্রয়াস চালাতে হবে। পড়া লেখার শেষে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে হবে। নিরাপত্তার বিষয়েও প্রশাসনিক কর্মপন্থা আরো উন্নত হওয়া জরুরি। তবে যারা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ইউরোপ যেতে চায় তাদের কথা ভিন্ন।

লেখক: সাংবাদিক, উপসম্পাদক।