এখনকার "একুশ" এ চেতনা নেই, রং আছে


মিজানুর রহমান

কুমড়ো ফুলে-ফুলে; নুয়ে পড়েছে লতাটা,

সজনে ডাঁটায় ভরে গ্যাছে গাছটা
আর, আমি; ডালের বড়ি শুকিয়ে রেখেছি,
খোকা তুই কবে আসবি। কবে ছুটি?”
চিঠিটা তার পকেটে ছিলো, ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা।
“মাগো, ওরা বলে, সবার কথা কেড়ে নেবে ;
তোমার কোলে শুয়ে গল্প শুনতে দেবে না।
বলো মা, তাই কি হয়?

আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ’র লেখা ‘কোন এক মাকে’ পড়া অনেকেরই। আমার ছোট বেলায় যখনই এই কবিতা পড়েছি, অমর একুশের প্রেক্ষাপটের একটা ছবি যেন চোখের সামনে ভেসে উঠতো। নতুন করে আবারো সামনে নিয়ে এলাম, অমর একুশ নিয়ে কিছু ব্যক্তিগত অনুভূতি বা ভাবনার কথা বলবো বলে।

অমর একুশ ১৯৫২, আমার ভাইয়েরা, ভাষা শহীদগণ আমাদের মায়ের ভাষায় আমাদের চেতনা বা অস্থিত্ব জানান দেয়ার জন্যে অকাতরে প্রাণ দিয়ে গেছেন যেদিন। কিভাবে পেলাম আমাদের মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার, ইতিহাস থেকে তুলে আনি। ”বাংলা’’ আমার ভাষা, আমার অহংকার, আমার গৌরব, মৃত্যুঞ্জয়ী ভাষা শহীদদের জানাই অবনত, অতল, বিনম্র শ্রদ্ধা আজ।

আমরা সবাই কম বেশী জানি ইতিহাস। তারপরও একুশের সেইদিনটির প্রেক্ষাপটটি আরো একবার পড়ি, জানি। ভাষা আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) সংঘটিত একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন, যা ছিল বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান গঠিত হয়, কিন্তু পাকিস্তানের দুটি অংশ পূর্ব পাকিস্তান (পূর্ব বাংলা হিসেবেও পরিচিত) ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ভৌগলিক ও ভাষাগত দিক থেকে পার্থক্য ছিল প্রচুর। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, যা পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী জনগণের মধ্যে তুমুল ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী মানুষ (যারা সংখ্যার বিচারে সমগ্র পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল) এ সিদ্ধান্তকে মোটেই মেনে নিতে চায়নি। পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাভাষার সম-মর্যাদার দাবীতে শুরু হয় আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর খাজা নাজিমুদ্দিন জানান যে পাকিস্তান সরকারের সিদ্ধান্তই মেনে নেওয়া হবে। এই ঘোষণার ফলে আন্দোলন আরো জোরদার হয়ে ওঠে। পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে মিটিং-মিছিল ইত্যাদি বেআইনি ঘোষণা করে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি (৮ই ফাল্গুন ১৩৫৮) এই আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুসংখ্যক ছাত্র ও কিছু রাজনৈতিক কর্মী মিলে মিছিল শুরু করেন। মিছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ মিছিলের উপর গুলি চালায়। গুলিতে নিহত হন সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারসহ আরো অনেকে। এই ঘটনায় সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষোভের আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে কেন্দ্রীয় সরকার গণ আন্দোলনের মুখে নতি স্বীকার করে এবং ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি প্রদান করে।

২০০০ সালে ইউনেস্কো বাংলা ভাষা আন্দোলন ও মানুষের ভাষা ও কৃষ্টির অধিকারের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে ঘোষণা করে। প্রায় চৌষট্টি বছর আগে এইদিনে হুঙ্কার দিয়েছিল বাঙালি, বলেছিল আমি মা ডাকতে চাই মায়ের ভাষায়। আর আমরা আজও মা ডাকি, কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করি সেই দিনের সেই হুংকারী বাঙালিদের।

কবিতায় স্মরি, একুশ মানেই আসছে; সালাম ফিরে আসছে; বরকত ফিরে আসছে; তাজুল ফিরে আসছে; একুশ মানেই মুক্তিযুদ্ধ ফিরে আসছে; সেই সাহসী বুক পেতে দেয়া তারণ্য ফিরে আসছে; তারন্যের চোখে দুর্জয় শপথ ফিরে আসছে; শহীদেরা ফিরে ফিরে আসছে। একুশ মানেই বাংলা ভাষার দিন আসছে; কৃষ্ণচূড়া পলাশের দিন আসছে; দুনিয়া কাপানো দিন আসছে; শহীদেরা ফিরে ফিরে আসছে।

হাসান হাফিজুর রহমান রচিত ‘অমর একুশে’ এই কবিতাটি ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলের সময়ে রচিত হয় এবং ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ কাব্যসংকলনে ১৯৫৩-তে প্রথম প্রকাশিত হয়। এটি পরে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বিমুখ প্রান্তর’-এ অন্তর্ভুক্তহয় ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারীতে সংঘঠিত ভাষা আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পটে লিখিত এ-জাতীয় আরও কবিতা রয়েছে।

যেমন আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী। আমি কি ভুলিতে পারি, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ রচিত ‘মাগো ওরা বলে’ ইত্যাদি। আছে মহাদেব সাহার ”একুশের গান” সহ আরো অনেক!!!

আপনারা নিশ্চয়ই অনেকেই জানেন ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ একুশের প্রথম কবিতা। কবিতাটির সাথে সবাই কমবেশী পরিচিত। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলিবর্ষনের খবর পেয়ে সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে বসে কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী জ্বরাক্রান্ত অবস্থায় কবিতাটি লিখেন। মূল কবিতাটি ছিল প্রায় ১৭ পৃষ্ঠার। দীর্ঘকাল নিষিদ্ধ থাকায় সমগ্র কবিতাটি এখন আর পাওয়া যায় না। চট্টগ্রাম থেকে বই আকারে কবিতাটি বের হবার পর কবিতাটি বাজেয়াপ্ত করে তৎকালীন পাকিস্থান সরকার।

একুশের প্রথম গানটি আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী; আর এটির গীতিকার: আবদুল গাফফার চৌধুর, সুরকার: আলতাফ মাহমুদ। এটিও নিশ্চয়ই আমরা জানি, তবে জানেন কি প্রথমে আব্দুল লতিফ সুর করেছিলেন এই অমর গানটির।

তবে আমার কেন যেন মনে হয় একুশকে নিয়ে অনেক বেশি ভালো গান হওয়া উচিত ছিলো আরো বাংলাদেশে। যদিও বাংলা সব গানই তো আমাদের একুশের জন্যই পাওয়া, বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরই কিছু গান শুধুই বাংলা ভাষার মাধুর্য নিয়ে গাওয়া উচিত বলে আমি প্রায়ই ভাবি।

তবে যে গান গুলো হয়েছে তার সব গুলোই অসধারন স্পর্শ করা গান । মনে গেঁথে যাওয়া গানের একটি আমায় গেথে দাও না মাগো; কথা : নজরুল ইসলাম বাবু; সুর: আলাউদ্দিন আলী এবং শিল্পী রুনা লায়লা যেটিতে কন্ঠ দিয়েছেন।

আর একটি গান, একুশে ফেব্রুয়ারী – কালিতেও নই স্পন্দনের শিল্পী নাসির উদ্দিন অপু গেয়েছেন এই গানটি, গানটির সুরকার এবং গীতিকারও অপু।

পুরনো খবর আবার স্মরনে আনি, আমাদের ”মাতৃভাষা” বাংলা পশ্চিম আফ্রিকার ”সিয়েরা লিওন” এ পেয়েছে দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা! দেশটির জাতিসংঘ শান্তি মিশনে কাজ করা ৩১ টি দেশের মোট ১৬৮৩০ জনের শক্তিশালী ফোর্সের/সৈন্যদল এর মাঝে বাংলাদেশের ৫৩০০ এরও বেশি সৈন্যের অসামান্য কাজের অবদানকে সম্মান জানিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট আহমেদ তিজান কাব্বাহ এই ঘোষণা দেন। সিয়েরা লিওনের ২৪ টি ভাষার মাঝে বাংলা একটি, তাদের অফিসিয়াল ভাষা ইংরেজি।

এটি প্রথম শুনে খুব ভালো লেগেছিল। আসলে মাতৃভাষার প্রতি এই টান’ টা আমার মনে হয় পরবাসি জীবনে, একটু বেশি অনুভব করা যায়। যখন প্রথম অস্ট্রেলিয়া এলাম, সিডনিতে ছিলাম কিছুদিন, লাকেম্বা’ বলে একটা জায়গা আছে ওখানে হঠাৎ যখন বাংলায় লেখা কিছু সাইনবোর্ড চোখে পড়ল, সে এক ভীষণ অন্যরকম অনুভুতি, বুকের মাঝে অন্যরকম সুখ জাগানিয়া।

আমার চার বছরের ছেলে নভোঃ প্রথম কিছুদিন বাইরে গেলেই বাংলায় কারো কথা শুনলেই চেঁচিয়ে বলতো ”আম্মু আম্মু বাংলা” ওর এই কথা দিয়েই কতজনের সাথে যে পরিচয় হয়েছে।

স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলাম এডেলেড, সাউথ অস্ট্রেলিয়াতে ২০০৯ এ, সেখানে TAFE Institute সিটি ক্যাম্পাসে ঢুকতে যেয়ে দেখি ওদের ইংলিশ কোর্সের জন্যে যে তথ্য কেন্দ্র সেখানে বিশাল একটা বোর্ড রেখেছে। ওয়েলকাম লেখা অনেকগুলো ভাষায়, আমি থমকে দাড়িয়ে বাংলা খুঁজছিলাম কিন্তু না দেখে একটু হতাশই হলাম, অফিসে কথা বলে জানলাম এটা তাঁরা করতেই পারেন, বিষয়টা নির্ভর করে কত সংখ্যক বাংলাভাষাভাষী ছাত্রছাত্রী বা বসবাসরত মানুষ আছে ওখানে তাঁদের চাওয়ার উপর।

বিদেশ জীবন, খুব বেশীই ব্যস্ত জীবন, এইরকম বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার সময় সুযোগ এবং মানসিকতার লোক হাতে গোনা। আমি একা কিছুই করতে পারলামনা। যা পারলাম, নিজের কাজের জায়গায় বাংলা বছরের প্রথম দিন, আমার সব মাল্টি কালচারাল সহকর্মীদের শিখিয়েছি ‘শুভ নববর্ষ’ তাঁরা আগ্রহ করে শিখেছেন। এক ১৪ এপ্রিল যেয়ে দেখি অস্ট্রেলিয়ান ক্যাম্পাস ম্যানেজার আমার ডেস্কে লিখেছেন ‘’শুভ নববর্ষ’’ ইংরেজীতে!!! এটা এক টুকরো ‘বাংলা’ ভালোলাগা।

কাজ করছি বাংলা কমিউনিটি রেডিওতে, প্রায় ৩ বছর করলাম রেডিও বাংলা এডেলেড এ এখন করছি রেডিও বাংলা মেলবোর্ন এ, সপ্তাহে একটি দিন এখানকার ইথারে ইথারে এক ঘণ্টা বাংলায় কথা বলি মন খুলে বিদেশ বিভূঁই এ সুখের নেই কোন সীমানা।

আমরা কেউ না কেউ বাংলার কথা কই, বাংলা ভালোবাসি। আমি মনে করি ”মানুষের মায়ের ভাষা” এটি আসলে শুধু একটি ভাষা না, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু, তার অস্থিত্ব, তার নিজস্বতা; স্বকীয়তা এবং আত্মমর্যাদা বোধের জায়গা।

বারবার বলতে ইচ্ছে করে ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’! সেই ১৯৫২ তে যখন আমাদের উপর রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দেয়া হচ্ছিলো, আমাদের পূর্ব পুরুষেরা হুঙ্কার দিয়ে সেটি প্রতিহত করেছিলেন কারণ, সেটি ছিল একটি চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত এবং ছিল আমাদের অস্ত্বিতের প্রশ্ন। আমাদের চেতনা’কে রোধ করার নীল নকশার শুরু এবং আমরা সেটি দেইনি, আমরা তাই আজ মাথা উচু করে গর্ব করে বলতে পারি আমরাই পৃথিবীতে একটা জাতি যাদের আছে ”মায়ের ভাষা কে” বুকে ধারণ করার জন্যে, কথা বলবার অধিকার ছিনিয়ে আনার জন্যে অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দেয়ার মত গৌরবময় ইতিহাস।

সেই চেতনারই ধারাবাহিকতা আমাদের, ৬৯, ৭১ এবং এরই ধারাবাহিকতা বলা যায় আমাদের ১৯৯০ এবং ২০১৩ এর নতুন প্রজন্মের জাগরণ।

ভাষার মাসে তাই আমার একটিই প্রত্যাশা- মানুষের সেই চেতনা বোধ জাগ্রত থাকুক। বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর প্রতিটি ব্যাক্তি ও জাতিগোষ্ঠির মাতৃভাষার অধিকার হোক নিশ্চিত। আমার সন্তানের মতোই মারমা অথবা তুতশী শিশুটি নিশ্চিন্তে কথা বলুক তার মায়ের ভাষায়- নিরাপদ থাক তার প্রতিটি বর্ণমালা।

এটা ঠিক প্রতিটা জাতি বা ব্যাক্তি মানুষের মায়ের ভাষাই কিন্তু তাঁর অস্থিত্ব। হয়তো জীবন জীবিকার তাগিদে, কখনো প্রয়োজনে বা শখ করে অন্য কোনো ভাষা শিখি আমরা। কিন্তু তারপরও মানুষ জন্মের পর প্রথম যে ভাষায় কথা বলতে শেখে, সেটার মতো সাচ্ছন্দ আর সুখ আর কোনো কিছুতেই মেলে না।

আমি মনে করি, মাতৃভাষা এবং নিজস্ব সংস্কৃতি’কে বুকে ধারণ করা একটা জাতির জন্যে খুব জরুরি, কারণ এটি তাদের স্বকীয়তা, এর মাধ্যমেই জন্ম নেয় দেশ এর প্রতি মমত্ব বা প্রেম। আর এই দেশপ্রেমই শুধু দিতে পারে একটি দেশকে পুরো বিশ্ব মানচিত্রে আপন মহিমায় জায়গা করে মাথা উচু করে দাড়াবার।

আমরা যদি আমাদের মাতৃভাষার প্রতি এই টানটা বিদেশের মাটিতেও ধরে রাখতে পারি, সেটিও অনেক ভাবে দেশকেই তুলে ধরা বা তার অর্থনীতিকে প্রভাবিত করা। আজ আমরা পুরো বিশ্বে চীন’কে দেখছি. বিভিন্ন দেশে দেশে আজ ওদের মেন্ডারিন ভাষা শেখার স্কুল হচ্ছে। দুবাইতে শুধু ভারতীয়দের আধিপত্যের জন্যে হিন্দি ভাষা বিশেষ গুরত্ব পাচ্ছে; পাচ্ছে কানাডাতেও।

তবে আমি আমার মাতৃভাষার প্রতি সবটুকু ভালবাসা রেখেই বলি শুধু মাত্র বিশ্বের সাথে তাল মেলাতেই ইংরেজি শেখাটাকেও অনেক সময় গুরুত্ব দিতে হয়। কারণ আপনি আমাদের দেশের দিকে তাকিয়ে দেখেন অনেক মেধাবী ছেলে মেয়ে শুধু ইংরেজিটা ভালো ভাবে না জানার জন্যে অনেক সময় আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থায় তার কাঙ্খিত চাকরিটা কিন্তু পাচ্ছেনা।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমার ছেলেবেলা’য় বলেছিলেন ‘আগে চাই বাংলা ভাষার মজবুত গাঁথুনি; তারপর ইংরেজি শেখার পত্তন’, ১০০ বছর পরও আমাদের এই বাস্তবতা অনুধাবন করা জাতি আর হলো কই!

আমি আজ প্রবাসী, আমরা যারা বাঙালী, বাংলাদেশী আমাদের ছেলেমেয়েরা যারা এখানে বড় হচ্ছে; তাদের জন্যে এখানে ছোট আঙ্গিকে হলেও বাংলা স্কুল হচ্ছে। তবে এখানে জন্ম হয়েছে বা বাংলাদেশ থেকে একদম ছোট বয়েসে চলে এসেছে এমন বাচ্চাদের অনেক মা-বাবা কেই দেখেছি ওদের ইংলিশ শেখানোর জন্যে খুব তোড়জোড় করেন।

আমার মনে হয়না এটার দরকার আছে, ওরা এটিতো শিখবেই। বরংচ ওদের সাথে বাসায় থাকা পুরো সময়টুকু চেষ্টা করুন বাংলা বলতে। সম্ভব হলে বাংলায় যেসব ভালো প্রোগ্রাম আছে ইউটিউবে ওদের’কে দেখান। কারণ ও যখন বাংলাদেশে বেড়াতে যাবে দাদা-দাদী নানা-নানী বা আত্তীয় স্বজনদের সাথে খুব ভালো ভাবে মিশতে পারবে, ভাষাগত যোগাযোগটা হবে সাবলীল। এতে ওর মাঝে পারিবারিক বন্ধনটা আরো সুদৃঢ় থাকবে হয়তো।
”২১” নিয়ে লিখতে বসে আজ নিজেকে থামাতে পারছিনা, একুশের নানান গৌরব গাঁথার কথা আরো বলতে ইচ্ছে করছে। তারপরও আরো একবার কবিতায় খুঁজি আশ্রয়। ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের লেখা

”একুশে ফেব্রুয়ারি”
‘একুশ মানেই উৎসব নয়, রথ-দোল বা চড়কের
‘একুশ মানেই একটা ছবি রক্তে-ভেজা সড়কের
‘একুশ মানেই প্রতিষেধক বাংলা-ভাষার মড়কের
‘একুশ মানেই মারণ-অস্ত্র পিচাশ-সহ নরকের।
‘একুশ মানেই মিটিং-মিছিল , বক্তৃতা আর গল্প না
‘একুশ কথার ফুলঝুরি নয় , কিংবা রঙীন কল্পনা
‘একুশ মানেই হৈ-হুল্লোড় , হাসি-খুশির মন্ত্র না
‘একুশ মানেই ভাই-হারাদের বুকের অসীম যন্ত্রণা।
‘একুশ আমার, ‘একুশ’ তোমার, সব সময়ের, সব্বায়ের
‘একুশ মানেই রফিক-সালাম, বরকত আর জব্বারের
‘একুশ মোদের মুখের ভাষা হীরে-মানিক-মরকতের
‘একুশ মানেই-বুকের আশা রফিক-সালাম-বরকতের।
‘একুশ এলেই বুক ফুলিয়ে চলছে মিছিল আজ পথে
‘একুশ মানেই রক্ত-জোয়ার বইলো ঢাকার রাজ পথে
‘একুশ মানেই বাংলাভাষা, এই একুশের দর কতো
‘একুশ মানেই রফিক-সালাম-জব্বার আর বরকতও
‘একুশ মানেই ‘ভাষা-দিবস‘, ‘একুশ’কে তাই বন্দি-রে
‘একুশ মানেই দুঃখ-সুখের বন্যা মনের মন্দিরে।

বাংলাদেশ, আজকের বাংলাদেশ যেখানে শিশুদের বর্ণমালা শিখাতে বড্ড বেমানান সব বিষয় তুলে আনা হচ্ছে, তাই ইচ্ছে না হলেও বলতেই হচ্ছে ‘আজ কি আমাদের বর্ণমালা অন্যরুপে দুঃখিনী বর্ণমালা’’!
আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে যে কথা না বললেই নয়, শোক বা সুখ পালনে যে সৌজন্যতা যা জানা ব্যাক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ খুবই বিরল হয়ে যাচ্ছে। যে ইতিহাসগুলো আমাদের সবচেয়ে গৌরবের এবং নিজস্ব তাকে ঘিরেও নেই আমাদের ঐক্য। ভাঙনের মুখে পড়ে হারাতে বসেছে আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং কৃষ্টি।

একুশ এলে আপনি সাদা-কালো পড়ে কাঁদতে বসে যাবেন এটা যেমন কাম্য নয়, কিন্তু একুশের সাথে কোনভাবেই যায়না ‘একুশের রেসিপি’ একুশের সাজ, ফ্যাশন শো। নাককরা কোন স্কুল যখন বীরশ্রেষ্ঠ’দের ছবি দিয়ে অমর একুশের ব্যানার টানান স্কুল গেইটে তখন আমরা বিস্মিত হই, শিশুদের আসলে কি বা কিভাবে জানানো হচ্ছে আমাদের প্রতিটা ইতিহাস।

দেশের কোন পত্রিকা যখন রেসিপি নিয়ে একুশকে স্মরণ করে, তখন আমাদের একটু বেশীই হতাশ হতে হয় বৈকি। একুশের রেসিপি, নিয়ে কাজ করছেন কেমন সেই ফিচার সম্পাদক, কোথায় তার বাস।

বাংলাদেশে অমর একুশে ২১ টাকা ছাড় জাতীয় কোন বিজ্ঞাপন দেখলেও ভালো লাগেনা আমাদের, অস্বস্তি হয়।
টিভি মিডিয়াতে নিউজ করতে এসে বা নিউজ পড়তে এসে যদি কোন কড়া ম্যাকাপের ছবি দিয়ে ফেসবুক পোস্ট দেন, একুশের সাজে আমি। কেমন যেন দুইবার ভাবতে হয় বিষয়টা, একুশের যেকোন অনুষ্ঠান আয়োজনে আমরা সাদা-কালো পোশাক পড়ি, পরিপাটি হয়েই আজ প্রভাত ফেরিতে যাই, আমরা ছবি দিয়ে বলতেও পারি ‘অমর একুশের আয়োজনে’ আমি বা আমরা। কিন্তু ছবি পোস্টে সংবাদ বা সাংবাদিকগণ কি বার্তা দিচ্ছেন সেটা বোধ হয় তাদের জানা জরুরী। তাদের সাজ না কাজ, না বোধ, না অন্যকিছু, পরিষ্কার হতে হবে অন্যদের কাছে। ভাববেন আশা করি।

যারা ‘একুশ কে ধারণ করেন’ বা ভাবছেন তাঁদের কাজ অনেক বেশী আজকের বাংলাদেশে, অনেক বেশী। মুক্তিযুদ্ধের মুল চেতনা ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ যেভাবে হারাতে বসেছে আজকের বাংলাদেশে, আশঙ্কা হয় আমাদের ‘বাংলা’ও বুঝি আজকের হুমকির মুখে নানামুখী আক্রমণে। বিশেষ করে আজকের বাংলাদেশে খুব বেশীই চোখে পড়ে, মধ্য আরবের বাংলাদেশী, পাকিস্থানী বাংলাদেশী, যাদের কাছে বাংলা নয়, ইংরেজীও নয় সবার আগে অন্য কোন ভাষা। তাই আজ ভীষণ দরকার জেগে উঠবার বাংলাদেশের বাংলাদেশী মানুষের বাংলা ভালবেসে, আসুন বাংলায় ভালোবাসি।

”মাতৃ ভাষা”কে ঘিরে আপনার যে মমতা তা অটুট থাকুক, পৃথিবীর সব শিশুরা তাদের মায়ের বুকে শুয়ে নিশ্চিন্তে শুনুক তার মায়ের ভাষায় বলা প্রথম গল্প!!!

ads