শিশুরা পায়ে ধরে ভিক্ষা চাবে, আপনি বিব্রত হবেন! পর্ব-০৫


মোঃ রেদওয়ানুল হক মিলন

আচ্ছা আমার আপনার সামনে একজন পথশিশু যখন হাত পেতে কিছু চায় তা দেখতে কেমন লাগে? তারওপর কোমলমতি শিশুরা যদি পায়ে ধরে কিছু না পাওয়া পর্যন্ত পা দুটি ধরে বসে থাকে তখন অনুভূতিটা কেমন হয়?

আমরা কি আদৌ ভাবি একজন বয়স্ক মানুষ, প্রতিবন্ধী কিংবা অনাথ কোনো শিশুকে ভিক্ষা করতে নামতে হয়? সমাজে সত্যিকার অর্থেই বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো অসহায় অবস্থায় আছে। তার চেয়েও বেশিসংখ্যক বিত্তবান মানুষ আছে যারা তাদের মানবিক হাত বাড়িয়ে দিলে নিশ্চিতই মানুষের অসহায়ত্ব দূর হতে পারে।

বিশেষ করে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিৎসা-শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার বঞ্চিত শিশুরা মানুষ হওয়ার দিশাটা খুঁজে পেতে পারে। কিন্তু সমাজ থেকে ভিক্ষা দূর করবার চেষ্টা না করে বিপুলসংখ্যক অসাধু মানুষ বরং ভিক্ষুকদের পুঁজি করে বাণিজ্য করে!

দু:খজনক হলেও সত্যি পেটের দায়ে পড়ে ভিক্ষা করতে নামার চেয়ে ভিক্ষাব্যবসায়ীদের সংখ্যা আজ-কাল অনেক বেশি। সেসব লোভী ভিক্ষা সর্দারা সারাদেশ থেকে অসহায় পঙ্গু বা প্রতিবন্ধীদের বিভিন্ন  শহরে জড়ো করে! এমনকি মায়ের কোল খালি করে শিশুদের চুরি করে তাদের হাত পা কেটে পঙ্গু করে দিয়ে ভিক্ষের উপযোগীও করে তোলে!

এভাবে বিভিন্ন পন্থায় বিভিন্ন শহরে ভিক্ষা করে প্রতিদিন প্রায় আয় করে ২০ কোটি টাকা মতো। মাসের হিসেবে যা ৬০০ কোটি টাকা প্রায়। প্রান্তিক পেটেভাতে ভিক্ষুকরা এই বাণিজ্যের কানাকড়ি না পেলেও ভিক্ষুকের দালালশ্রেণি অনেকেই আঙ্গুল ফুলে গলাগাছ বনে গেছে। অথচ শিশু বা অসহায়দের ভাগ্যের কোনো বদল নেই। আর আমরা পরকালের চিন্তায় অথবা মানবতার দাবিতে কত অজানা ভিক্ষা ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ব্যালেন্স ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় করে তুলছি!

তবে জনমানুষের এমনতর সমস্যা চিহ্নিত করে দূর করবার বড় দায়িত্ব  আমাদের সরকারের। কিন্তু সরকার কি তার ওপর অর্পিত দায়িত্বপালনে আন্তরিক?

আমি প্রায় বিভিন্ন কবি, লেখকদের গল্প কবিতা পড়ি, সেদিন কবি শেখ হাবিবুর রহমানের নবীর শিক্ষা’ নামে একটি কবিতা আছে সেটা পড়তেছিলাম।

জনৈক দীনদরিদ্র এক লোক বিবি-বাচ্চাসহ তিনদিন অভুক্ত থাকার পর নবী(সা.)-এর কাছে গেলেন কিছু সাহায্য চাইতে। নবী বললেন, তোমার ঘরে কোনো জিনিস নেই? লোকটি একটি কম্বল থাকার কথা জানাল। নবী কম্বলটি নিয়ে এসে তা বিক্রি করে অর্ধেক মূল্য অসহায় লোকটির খাবার কিনতে দিলেন আর বাকি অর্ধেক টাকা দিয়ে একটি কুঠার কিনে দিয়ে বনে গিয়ে গাছ কেটে জীবিকা নির্বাহের পরামর্শ দিলেন। এভাবে লোকটার দু:খ ঘুচল। ওই কবিতার শেষ ক’টি পঙক্তি এমন-
নবীর শিক্ষা ক’রোনা ভিক্ষা
মেহনত ক’রো সবে!

কিন্তু বাঙালি মুসলমান নবীর বুদ্ধি শুনবে এমন ধর্মাচারী তারা না। বরং ভিক্ষাবাণিজ্যে পাওয়া অর্থে ফি-বছর হজ্ব করে নিজেদের ইজ্জতের উচ্চতা এভারেস্টে নিয়ে যাবে, হতাশা, অসহায়ত্ব ও দারিদ্রতার চাষ করে বেড়াবে! বিস্ময়কর সত্যি এটাই!

শিশুরা পায়ে ধরে থাকবে, আপনি বিব্রত হবেন, আপনার মনে কারুণ্য ভর করবে, ছবি তুলবেন, ক্ষণিকের জন্য হাহুতাশ করবেন এই যা! কিন্তু যে বুড়ো ভণ্ড-বদমাশ ইবলিশের সারথীরা শিশুদেরকে ভিক্ষা করতে নামিয়ে দিয়ে ফাইভ স্টার হোটেলে গিয়ে এসি খায়,

মাসে মাসে বিদেশ ভ্রমণ করে তাকে না ছুঁতে পারব আমরা না পারবে ভাবলেশহীন এই রাষ্ট্র! কাজেই ভিক্ষুকের জাতি হিসেবে আমাদের যে বদনাম ছিল, ভবিষ্যতে এই অস্বস্তিকর বদনাম ঘুচে যাবে তা আর কে বলতে পারে?

লেখকঃ মোঃ রেদওয়ানুল হক মিলন

সভাপতি, বাংলাদেশ তরুন লেখক পরিষদ, ঠাকুরগাও জেলা।

[email protected]