আমেরিকায় আক্রান্তের সংখ্যা ৪ লাখ ছাড়াল, মৃত্যু ১২৮৫৪

নিউইয়র্কে করোনায় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশিদের মৃত্যু হার কেন বেশি?


নিউইয়র্ক করোনা লাশ

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের আমেরিকার পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। দিন দিন হুঁ হুঁ করে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। লকডাউনের পর যদিও বিশ্বের রাজধানী খ্যাত নিউইয়র্কের রোগীর সংখ্যা হাসপাতালে কিছুটা কমেছে তবে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। আজ মঙ্গলবার নিউইয়র্কে দুইজন বাংলাদেশি মারা গেছেন। তাঁরা হলেন- আকমল হোসেন ও মাইনুল হক জুয়েল। আমেরিকায় এ নিয়ে ৮৪ বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করল আওয়াজবিডি।

শুধু মৃত্যু নয় আক্রান্তের দিক দিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্কের অবস্থান সবার ওপরে। কোভিড-১৯ রোগী হিসেবে শনাক্ত মানুষের সংখ্যা এখন ১ লাখ ৪২ হাজার ৩৮৪ জন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে  ৫ হাজার ৪৮৯ জনের।

এদিকে ভাইরাসের ছোবলে নাকাল হওয়া অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিরা বেশী আক্রান্ত হয়েছেন। বহু জাতিগোস্টির নিউইয়র্ক নগরীতে প্রতিদিন স্বদেশীদের মৃত্যুর খবর আসছে।

আর এই আক্রান্ত ও মৃত্যুর পেছনে অভিবাসী হিসেবে আমাদের কর্মজীবন, সচেতনতার অভাব এমনকি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন আচরণ এরজন্য দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে। জীবিকার তাগিদে বা একসাথে জমায়েত হয়ে বাজার, আড্ডা ও রাজনীতির কথাবার্তা নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমও ছিল কয়েকেদিন আগেও ছিল নিয়মিত চিত্র। লকডাউন জারি করার আগেই যখন নিউইয়র্কে  করোনার আক্রান্ত হওয়ার খবরে সবাই আতঙ্কে তখনও প্রবাসীরা কোন ধরণের সচেতনাতা বা করোনা নিয়ে বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা করেন নি।

নিউইয়র্কে বাংলাদেশি সংগঠন কয়েক শতাধিকের বেশি। অভিযোগ আছে এসব সংগঠনগুলো করোনার প্রাদুর্ভাবের সময়ও একসঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডায় রেস্টুরেন্টে বসে বৈঠক কার্যক্রম করেছেন। যার ফলে এখন অনেকেই সেই ভুলের মাশুল দিচ্ছেন। করোনার কারণে হারিয়েছেন নিজের পরিবারের মা, কেউ বাবা, কেউ চাচা নয়তো খালা।

মরণব্যাধি এই ভাইরাসের কারণে কেন এতো বাংলাদেশিদের করুণ মৃত্যু তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে আওয়াজবিডি।

রিপোর্টে উঠে আসে বাংলাদেশ পরে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এমনকি চীনেরও কেউ মৃত্যুর মিছিলে বাংলাদেশিদের মতো নেই। এর প্রধান অন্যতম কারণ শিক্ষা এবং উন্নত জীবন ধারায় প্রবাসীরা অনেকটা পিছিয়ে। এছাড়া প্রবাসীরা বেশিরভাগ এখনো ভারত ও পাকিস্তানের মতো ভালো চাকরি বা উন্নত জীবনযাপনে অব্যস্ত হতে পারেন নি। বেশিরভাগ অভিবাসীরা ক্যাব, রেস্টুরেন্ট, ডেলিভারি এসব চাকরি করেন। এমনকি দিন শেষে কাজ করে চায়ের সঙ্গে আড্ডা ও ঘরে গাদাগাদি করে থাকাটাও নিয়মিত দৃশ্য। ধারণা করা হচ্ছে এসব থেকে করোনার প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশিদের গ্রাস করেছে।

এ সম্পর্কে নিউইয়র্কে বসবাসরত একাধিক বাংলাদেশি চিকিৎসক এবং সমাজ ভাবনার সাথে জড়িত লোকজনের সাথে কথা বললে, তারা এ অভিমত প্রকাশ করেছেন।

এ বিষয় নিয়ে কথা হয় নিউইয়র্কে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ  ডাক্তার ফেরদৌস খন্দকারের সাথে।

তিনি জানান, এমনিতেই আমেরিকায় করোনাভাইরাস পরিস্থিত মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিয়ে এমনিতেই বিলম্ব ছিল। এর ভয়াবহতার সাবধানতাবাণী আমাদের কমিউনিটির কাছে বেশ আগে থেকে পৌঁছেনি। ভাইরাসটির আক্রমণে আমাদের লোকজন শুরুর হামলায় পড়ার কারণ, নিউইয়র্কে বাংলাদেশি কর্মজীবীদের বিশাল অংশ সামনের সারিতে কাজ করা কর্মজীবী।

এর মধ্যে ক্যাব চালক , হোটেল-রেস্তোরার কর্মী , গ্যাস স্টেশনের কর্মীরাও রয়েছেন। দেখা যাচ্ছে , ২৫ থেকে ৬০ বছরের নীচে বয়সের বাংলাদেশিরা শুরুতেই আক্রান্তের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকের মৃত্যু ঘটেছে। পাশাপাশি একই এলাকায় বসবাসরত ভারতীয় বা অন্যান্য উপমহাদেশীয় অভিবাসীদের কর্মজীবীরা অনেকটাই পরবর্তী ধাপে কাজ করছে বেশী অংশ। ভাইরাসের প্রথম হামলায় শিকার হওয়া এসব বাংলাদেশিদের জের ধরেই পরিবারের লোকজন আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। প্রবাসেও আমাদের অনেক পরিবারই একান্নবর্তী ।

অনেকেই একই বাসায় পরিবার, সন্তান , মা বাবা , শ্বশুর শাশুড়ি নিয়ে থাকেন। ভিন্ন সময়ে এমন বসবাসের ভালো দিক থাকলেও চলমান সংকটে এ বিষয়টিকেও অনেকটা কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। 'লকডাউন' শুরু হওয়ার পর নিজেদের ঘরে অনেকের পক্ষে পৃথক থাকা সম্ভব হয়নি। অনেক লোকজনের বাস এক ঘরে । রান্না ঘর থেকে বাথরুম তাদের শেয়ার করতে হয় অনেকজন মিলে।

নিউইয়র্কে বাংলাদেশি প্রায় তিনশতাধিক চিকিৎসকসহ পাঁচ শতাধিক স্বাস্থ্যসেবী(নার্স ,ইএমএস )রাও সামনের সারির কর্মজীবী। এরাও আক্রান্ত হয়েছেন একদম শুরুর দিকে। নিউইয়র্কের পুলিশে , ট্রাফিকে কাজ করা বাংলাদেশিরাও করোনার প্রথম ধাপের হামলার শিকার হয়েছেন।

ডাক্তার ফেরদৌস আরও বলেন, এখন অনেকেই আরেক দফা আক্রান্তের শিকার হচ্ছেন, নিজেদের কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রণ না করার কারণে। কখনো বাধ্য হয়ে বা কম সতর্ক অবস্থায় গ্রোসারী কিনতে যেয়ে , গ্যাস ষ্টেশনেও গিয়ে আক্রান্তের শিকার হচ্ছেন।

ডাক্তার ফেরদৌস জানালেন, তার এক রোগী টানা ১২ দিন নিজেকে বিচ্ছিন্ন রেখে একবারের জন্য টুথ পেস্ট কেনাকাটার জন্য বেরিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পরই অসুস্থ হয়ে পড়েন।

নিউইয়র্কে তরুণ বাংলাদেশি ডাক্তার রায়হান সিদ্দিকী বলেছেন, আমাদের লোকজনের খাদ্যাভ্যাস মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়। হোটেল রেস্তোরায় দল বেঁধে পিয়াজু, চানা ভাজি, পরটা , সমুছা খেতে গিয়ে অনেকের মধ্যে এ ভাইরাস ছড়িয়েছে। নিয়মিত ব্যায়াম না করা , অতিরিক্ত চাপের জীবন , ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে না রাখা, ধূমপান করাসহ স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন নিয়ে আমাদের লোকজনের সচেতনতার অভাব প্রকট।

এর কারণে শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতাও অনেকের চেয়ে দুর্বল বলে এসব ডাক্তাররা মনে করেন। বাংলাদেশিদের মধ্যে ডায়বেটিসের হার সবচেয়ে বেশী। অনেকেই এখানকার পরিবার , বাংলাদেশের পরিবার, স্বজন নিয়ে চাপের জীবনযাপন করেন - এটাকেও একটা বড় কারণ বলে দেখছেন এসব চিকিৎসকরা।

নিউইয়র্ক প্রেসপেটেরিয়ান হাসপাতালের পরিচালক তরুণ বাংলাদেশি ডাক্তার নাসিম চৌধুরী অপু বলেছেন , যারা ভালো হয়ে বাসায় আসছেন তারাও অন্যদের আক্রান্ত করতে পারেন। বাংলাদেশিদের মধ্যে যারা সুস্থ হয়ে বাসা থেকে ঘরে ফিরছেন , তারা যেন অন্ততঃ দুই সপ্তাহ ঘরের অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন।

ডাঃ নাসিম চৌধুরী বলেন , হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন নামের ওষুধ করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। আমেরিকার ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রাশন এ ওষুধটি এখনও অনুমোদন করেনি। তিনি বলেন, নিউইয়র্কের এয়ারপোর্টে আগত যাত্রীদের শুধু তাপমাত্রা দেখা হলেও করোনাভাইরাস সনাক্ত করার জন্য কোন টেস্টিং নেই। এ কারণে বাইরের দেশ থেকে ভাইরাসটি সহজেই আমেরিকায় প্রবেশ করেছে এবং ছড়িয়ে পড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

নিউইয়র্কে দীর্ঘদিন থেকে আছেন সাংবাদিক মাহবুবুর রহমান । তাঁর সাথে যোগাযোগ করা হলে এ বিষয়ে তিনি বলেন , সাংস্কৃতিক দিক থেকে আমাদের পরিবারগুলোতে প্রবাসেও অনেকের একসাথে বসবাসকে আমরা এতদিন ইতিবাচক হিসেবে দেখেছি। ব্যয়বহুল নিউইয়র্কে অনেক প্রবাসী বাধ্য হয়েই একই ঘরে , কোন কোন ক্ষেত্রে একই রুমে অনেকজনের বসবাস করতে হয়।

প্রবীণ এ সাংবাদিক বলেন, আমাদের কমিউনিটির নানা কোলাহলে জমিয়ে আড্ডা দেয়া, এটা ওটা খাওয়া এবং স্বাস্থ্য সমস্যাকে গুরুত্ব না দেয়াও চলমান সংকটের কারণ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

নিউইয়র্ক নগরীর হাসপাতালে কর্মরত প্রযুক্তিবিদ ইশতেহাক চৌধুরী জানান, প্রবাসেও আমাদের কমিউনিটির জীবন আচরণ অনেক ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যসম্মত নয়। দল বেঁধে আড্ডা দেয়া, একই গ্রোসারীতে, রেস্টুরেন্টে ভীড় করা সহ স্বাস্থ্য সতর্কবাণীকে গুরুত্বের সাথে না নেয়াকেও আজকের বাস্তবতার জন্য দায়ী বলে তিনি মনে করেন।

এদিকে করোনায় আমেরিকায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৪ লাখ ছাড়িয়েছে। সর্বশেষ এই ভাইরাসে ৪ লাখ ৪১২ জন আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে ১২ হাজার ৮৫৪ জন। সুস্থ্য হয়ে উঠেছে প্রায় ২১ হাজার ৬৭৪ জন রোগী।

ads