সেই শিশুর অবস্থা ভাল নয়


ভাল নয়

সন্দেহভাজন ভিক্ষাবৃত্তি চক্রের হাত থেকে যে শিশুকে উদ্ধার করেছিলেন এএসপি ইসরাত জাহান, সে শিশুর অবস্থা ভাল নয়। উদ্ধারের দিন গত ১৮ জুলাই থেকে সানজিদা নামের আনুমানিক ৭/৮ মাস বয়সী এই শিশু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে চিকিৎসাধীন।

ইসরাত জাহানের ভাষ্য- শিশুটির পিঠে কিছুটা দগদগে পোড়া দাগ ছিল ও মাংস কিছুটা বের হয়েছিল। অন্যদিকে, ঢাকা মেডিকেলে আনার পর ধরা পড়ে শিশুটি নিউমোনিয়া ও মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত। এই কয়দিন হাসপাতাল জীবনে কয়েকবার খিঁচুনিও হয় সানজিদার।

সোমবার (২২ জুলাই) ঢাকা মেডিকেলের শিশু বিভাগে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখা যায় শিশুটিকে। তার মুখে অক্সিজেনের মাস্ক লাগানো ছিল, কোমল দেহের চামড়ায় সুঁচ দিয়ে স্যালাইন চলছিল তখন। ২০৮ নম্বর ওয়ার্ডের তিন নম্বর বেডে শোয়া ছিল শিশুটি। এ ওয়ার্ডে কর্তব্যরত সিনিয়র স্টাফ নার্স সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ওকে আমরা ঘন ঘন দেখাশোনা করছি। খুব কষ্ট লাগে ওকে দেখলে।

৬০৮ নম্বর ওয়ার্ডের সহকারী রেজিস্ট্রার তাসনুভা খান বলেন, এই বয়সে যেমন ওজন থাকার কথা, তা ওর নেই। তাছাড়া বয়স অনুপাতে তার মস্তিষ্কের আকারও ছোট। জন্মগত ত্রুটির কারণে এটা হতে পারে। এছাড়া বয়স অনুযায়ী দরকারি যত্ন হয়ত পায়নি, সে কখনও বসতে পারেনি, দাঁড়াতেও হয়ত পারেনি। তার খিঁচুনি আছে। এটা মনে হয় জন্মগত সমস্যা। হাসপাতালে আনার পরও কয়েকবার খিঁচুনি হয়েছে।

তিনি বলেন,  পোড়া দাগটা আগের। তার নিউমোনিয়ার তীব্রতা কমেছে। খিঁচুনিটা কমেনি। ওষুধ পরিবর্তন করে আরও শক্তিশালী ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সাঈদা আনোয়ার বলেন, আমরা চেষ্টা করছি সাধ্যমতন। ঢাকা মেডিকেলের যতটুকু সক্ষমতা আছে, ততটুকু দেয়া হচ্ছে শিশুটিকে।

এএসপি ইসরাত জাহান জানান, বাচ্চাটির অবস্থা আসলেই ভাল না। আমরা খুব চেষ্টা করছি যে, কিভাবে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়। তার আইসিসিউ সাপোর্টও লাগতে পারে। সেই চেষ্টাই আমরা চালাচ্ছি।

সানজিদাকে উদ্ধারের কাহিনী:

গত ১৮ জুলাই সন্ধ্যার দিকে অফিসিয়াল কাজে অফিসের গাড়িতে চড়ে ঢাকার শিক্ষাভবন এলাকা প্রদক্ষিণ করছিলেন পুলিশ সদর দপ্তরের এএসপি ইসরাত জাহান। হঠাৎ তিনি দেখেন শিক্ষাভবনের কাছে পুলিশ বক্স ঘেঁষা ফুটপাথে আনুমানিক ৫/৭মাস বয়সী একটি কন্যাশিশু হাঁপাচ্ছে, তার পিঠে পোড়া দাগ এবং পাশে বসে একজন পুরুষ ভিক্ষা করছে শিশুটিকে সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করে।

মানবিক মন থেকে এএসপি ইসরাত গাড়ি থামিয়ে শিশুটির কাছে যান এবং ওই পুরুষের সাথে কথা বলেন অস্বাভাবিকতার গন্ধ পান। পরে শাহবাগ থানা পুলিশের মাধ্যমে ওই পুরুষ ও একজন নারীকে গ্রেফতার করে এবং সানজিদাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার- পরে শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।

এএসপি ইসরাত দৈনিক জাগরণকে বলেন, আমি দেখলাম শিশুটির পোড়া দাগ দগদগে, মাংস কিছুটা বেরিয়ে আছে। ওর চেতনা ছিল না। আমি ভাবলাম কোনো বাবা-মা তার শিশুকে এভাবে ফেলে রেখে ভিক্ষা করতে পারেন না। সেই থেকেই যাই এবং পুরুষ লোকটির কাছে জানতে চাই বাচ্চার অবস্থা। এসময় তিনি ‘’বাচ্চা আমার না’’ বলে দৌঁড়ে চলে যায়। এসময় আমার কাছেই ছিল শাহবাগ থানা পুলিশের টহল গাড়ি।

তাদের জানানো হলে আমিসহ দৌঁড়ে পুরুষ লোকটিকে আটক করে শিক্ষাভবন নিকটস্থ পুলিশ বক্সে আনা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, বাচ্চাটি জোস্না নামের একজনের। তার সহযোগিতায় জোস্নাকে আনা হয়। জোস্না অস্বীকার যান ‘’বাচ্চাটি তার নয়’’ বলে। এসময় জহিরুল ও জোস্নার মধ্যে পাল্টাপাল্টি কথায় স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, বাচ্চাটি জোস্নার কাছেই ছিল। সেখান থেকে এনে জহিরুল বাচ্চাটিকে নিয়ে ভিক্ষা করছিল। পরে জোস্না স্বীকার করেন- ৬/৭মাস আগে একজন বাচ্চাটিকে এনে তার কাছে দিয়ে যায়।

মামলার বাদি হয়েছেন শাহবাগ থানার এসআই শফিউল ইসলাম এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা এ থানারই এসআই জসিম উদ্দিন। তদন্তকারী কর্মকর্তা আজ সন্ধ্যায় বলেন, আমাদের সন্দেহ বাচ্চাটি জোৎস্না-জহিরুলের নয়। আর যদি হয়েও থাকে, তারপরও একটা শিশুকে এভাবে ভিক্ষার কাজে ব্যবহার করা আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ। তার উপর বাচ্চাটি এক ধরনের নির্যাতনের মধ্যে ছিল।

আদর-যত্নের স্বার্থে দু-একদিনের মধ্যে শিশুটিকে সমাজ সেবা অধিদপ্তরাধীন শিশুমনি নিবাসে দেয়া হবে বলে জানান জসিম উদ্দিন। তবে জোৎস্না-জহিরুল শিশুটির প্রকৃত বাবা-মা কি-না, তা নিশ্চিত হতে সিআইডির ল্যাবে ডিএনএ টেস্ট করা হবে বলেও উল্লেখ করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।

রেদওয়ানুল/ আওয়াজবিডি