আসন্ন বাজেটের কাঙ্ক্ষিত বাস্তবায়ন হচ্ছে না


বাজেট

উন্নয়নের মহাসড়কে প্রতিনিয়ত বাড়ছে আকাঙ্ক্ষা। বাড়ছে সরকারি ব্যয়। সেই তুলনায় বাড়ছে না কর আহরণ। ফলে বছর শেষে কাটছাঁট করতে হচ্ছে বাজেটে। তবুও শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত হারে বাজেট বাস্তবায়ন অধরাই থেকে যাচ্ছে। গত ১০ বছরে এই হার ক্রমেই কমছে। ২০১০-১১ সালেও বাজেটের ৯৫ থেকে ৯৭ বাস্তবায়ন হতো, সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হচ্ছে ৭০ শতাংশের আশপাশে।

এই প্রেক্ষাপটে এবারো বড় অঙ্কের তথা ৫ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিতে যাচ্ছেন নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এই অর্থ আহরণের জন্য এনবিআরকে দেয়া হচ্ছে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের টার্গেট। পাশাপাশি ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেও বড় ধরনের ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা অর্থমন্ত্রীর। নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন, প্রত্যক্ষ করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি করজাল সম্প্রসারণের মাধ্যমেই বাজেট বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে চান কামাল।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১০-১১ অর্থবছরের পর থেকেই ক্রমান্বয়ে কমছে বাজেট বাস্তবায়নের হার। ওই বছরে বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছিল ৯৭ শতাংশ। পরের বছর যা নেমে আসে ৯৩ শতাংশে। আর গত অর্থবছরে হয়েছে ৭০ শতাংশের কিছু বেশি। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে ২৭ শতাশের কিছু বেশি।

মূলত সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বিবেচনায় না নিয়েই উচ্চাভিলাষী বাজেট দেয়ায় এই হার কমছে। প্রতিবছর বাজেটে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকার বেশকিছু প্রকল্প হাতে নেয়। এর ফলে কিছু প্রকল্প পেছনে পড়ে যায়। আবার এমনো হয়েছে, ওয়ার্ক অর্ডার পাওয়ার পরও কাজে হাত দেয়নি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

এ ছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগে জটিলতা, জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণসহ নানা ধরনের অব্যবস্থাপনার কারণে নির্দিষ্ট সময় প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় না। বছরের শেষদিকে এসে প্রকল্প বাস্তবায়নের হিড়িক পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে অর্থবছর শেষ হলেও অর্থ রয়েই যায়, ব্যয় করা হয় না। অন্যদিকে কর আহরণে ব্যর্থতার কারণেও বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এসে অনেক প্রকল্প কাটছাঁট করতে হয়।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ প্রসঙ্গে বলেন, বর্তমান সময়ে কর আহরণে ব্যর্থতাই সবচেয়ে বড় সঙ্কট। এ ছাড়া এডিপি বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক অক্ষমতা রয়েছে সরকারের। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে অর্ধেক এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে। অর্থাৎ বাকি অর্ধেক এডিপি বাস্তবায়ন হবে ৩ মাসে। এটি শেষ পর্যন্ত কী রকম হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ-উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের হার এবং গুণগতমান কমে যাচ্ছে। সেদিক বিবেচনা করলে এই বাজেটকে উচ্চাভিলাষী বাজেট বলা যায়। ২০১২ সালে বাজেট বাস্তবায়নের হার ৯৩ শতাংশ থাকলেও চলতি অর্থবছরে তা ৮০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। তাই বাজেটের আকার বাড়ানোর আগে আমাদের বাজেট বাস্তবায়নের দক্ষতা বাড়াতে হবে।

অর্থমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে ১ লাখ ৩২ হাজার ১৭০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়। অর্থবছর শেষে বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে ৯৭ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। বাজেটের খরচের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা।

অর্থবছর শেষে ব্যয় করা অর্থের পরিমাণ ১ লাখ ৫২ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের হার ৯৩ দশমিক ১৮ শতাংশ। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ১ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে ব্যয় হয় ১ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাজেট বাস্তবায়নের হার ৯০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো বাজেটের আকার ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা হয়। বছর শেষে মোট বাজেটের মধ্যে ব্যয় করা যায় ১ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। বাজেট বাস্তবায়নের পরিমাণ ৮৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাজেট ঘোষণা করা হয় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। বাস্তবায়ন করা হয় ২ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে বাজেট বাস্তবায়নের হার ৮১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়। পরে তা কমিয়ে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করলেও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা।

বাজেট বাস্তবায়নের হার ৭৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাজেট আকার ছিল ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। বছর শেষে বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে ৭৬ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট আকার ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে এর আকার ২৮ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা কাটছাঁট করা হয়। বছর শেষে বাজেট বাস্তবায়নের হার দাঁড়ায় ৭০ শতাংশের কিছু বেশি।

অন্যদিকে চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেটের আকার ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। এই বাজেটেও রাজস্ব আদায় ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় মূল বাজেট থেকে প্রায় ২১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা কাটছাঁট করা হচ্ছে। এবার মূল বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা।

সংশোধিত বাজেটে এর আকার দাঁড়াচ্ছে ৪ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। এদিকে কাটছাঁটের পর সংশোধিত বাজেটও বাস্তবায়িত হয় না। সংশোধিত বাজেটের চেয়ে প্রকৃত বাস্তবায়নের হার আরো কম। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে জুলাই-ডিসেম্বর) বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে ২৭ দশমিক ৫১ শতাংশ। অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৪৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। ফলে বছর শেষে বাজেট বাস্তবায়নের হার গত অর্থবছরের চেয়েও কম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে বাজেটের আয়ের সবচেয়ে বড় উত্স এনবিআর। প্রতিবছর এনবিআরের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয় সামর্থ্যের অতিরিক্ত টার্গেট। আগামী অর্থবছরেও তার ব্যতিক্রম হবে না। আসন্ন বাজেটে মোট রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। যা জিডিপির ১৩ দশমিক ১ শতাংশের সমান।

যেখানে কর রাজস্ব ৩ লাখ ৪০ হাজার ১০০ কোটি, কর বহির্ভূত রাজস্ব ধরা হয়েছে ৩৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য দেয়া হচ্ছে। যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি।

যদিও চলতি অর্থবছরে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ করতে পারছে না এনবিআর। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত রাজস্ব আয় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে ৫১ হাজার কোটি টাকার বেশি।

এই সময় রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ। গত অর্থবছরে একই সময় প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে দুই লাখ ৩ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আহরণ হয় এক লাখ ৫২ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে এ সময় আয় হয় এক লাখ ৪৩ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা।

সিপিডি বলছে, যে হারে কর আহরণ হচ্ছে তাতে বছর শেষে প্রকৃত লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৮৫ হাজার কোটি টাকা কম আয় হবে। এই অবস্থায় আগামী অর্থবছরের বিশাল টার্গেট অর্জনে নতুন অর্থমন্ত্রী কী কী পদক্ষেপ নেন সেটাই দেখার বিষয়।

সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় মনে করেন, প্রতিবছর এডহক ভিত্তিতে যে করছাড় দেয়া হয় তার প্রকৃত হিসাব নেই। অথচ এটি কর আহরণে বড় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে। বাজেট বক্তৃতায় কর আহরণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দেখতে চান এই অর্থনীতিবিদ।