নারীদের ঈদের নামাজ ও মসজিদে জামাতে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গ


নারী নামাজ

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান। ইসলামের বিধানাবলীরনির্দেশনায় পবিত্র কোরআনে আদেশ ও নিষেধসহ যাবতীয় বিধানপ্রদানের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের জন্য একই রকম শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে। যেমন তোমরা সালাত কায়েম করো, তোমরা যাকাত দাও, তোমরা ভালো কাজের আদেশ করো ও মন্দ কাজের নিষেধ করো, তোমরা দ্বীন কায়েম করো ইত্যাদি। নারীর জন্য আদেশ একরকম; আর পুরুষের জন্য আদেশ ভিন্নতর – এমন কোনো শব্দপ্রয়োগ করা হয় নি। নারীকে ক্ষেত্র বিশেষে পুরুষের নেতৃত্বে বা অধীনে বা অভিভাবকত্বের চাদরে নারীর নিজের স্বার্থেই রাখারনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ক্ষেত্র বিশেষে পুরুষকে সীমিত পরিসরেনির্দিষ্ট সিগম্যান্টে একটু বেশী দায়িত্ব পালনের কারনে মর্যাদা বেশী দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া ইসলামের যাবতীয় বিধানাবলীতেও সকল নির্দেশনায় নারী-পুরুষের স্ব্যাতন্ত্রিকতাকে স্বীকার করেপৃথক নাফস বা রুহ হিসেবে আল্লাহ তায়ালা স্বীকৃতিই শুধুদেয়নি; বরং প্রত্যেকের কর্মফলের জন্য প্রত্যেককে পৃথকভাবে জিজ্ঞাসা করা হবে। শরীয়াতের বিধান পালনের ক্ষেত্রে প্রত্যাদেশীয় চেতনা গ্রহণ প্রক্রিয়ার বিশুদ্ধতা অধিকতর নির্ভূলতাও সত্যের নিকটে পৌঁছায়। এ জন্য কুরআন ও হাদীসেই হতে পারে একমাত্র সত্যের মাপকাঠি। বিভিন্ন লোক তাদের সময়ের আলোকে চিন্তা প্রসূত অনেক গবেষণা নির্ভর কথা বলতে পারেন; তা কোরআন ও সহীহ হাদীসের উপস্থিতিতে কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

হ্যাঁ, এ দুটির অবর্তমানে বিদগ্ধ পণ্ডিতদেরবক্তব্য বা গবেষণা নির্ভর নির্দেশনা গ্রহণযোগ্যই নয় কেবল বরং ইসলামের সৌন্দর্যকে আরো যথাযথ করেছে বা ভবিষ্যতে করবে। সেক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হবে আলোচ্য গবেষণা বা পর্যালোচনা কোরআনের কোনো নির্দেশনা বা সহীহ হাদীসের বিপরীতে গিয়েছে কিনা। সমাজের অনেক মানুষগণ এ পরিশুদ্ধ চেতনা পোষন করেন আর এ চেতনাটাই সঠিক, যথাযথ ও বাস্তব সম্মত। কারণ মানুষ কখনো ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। সে হিসেবে কারো প্রতি অন্ধ আনুগত্য করা ঠিক নয়। তাই মহানবী (সাঃ) এর বাণী পরোক্ষ প্রত্যাদেশ হিসেবে সরাসরি প্রত্যাদেশের মতোই নির্ভূল। আর একারণেই সকল যুগের ইমামগণ কোরআনের বা হাদীসের উপস্থিতিতে নিজের মতামতকে প্রধান্য দেন নি।

​আল কোরআনে সালাত কায়েম করার অর্থাৎ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাতের সাথে আদায়ের বাধ্যবাধকতা বর্ণিত হয়েছে নারী-পুরুষ সকলের জন্য। শুধু পুরুষের জন্য নয়। আর নারীদের ঈদের জামাতে অংশ গ্রহণ করার ব্যাপারে রাসূলের(সাঃ) নির্দেশনা রয়েছে। এর ভিতর দিয়ে কল্যাণে, ধর্মীয় জ্ঞান আহরনে ও ইসলামী বিধান পালনে তারা পুরুষের মতো নিজেদের এগিয়ে রাখার সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে। ফিতনার কথা বলে নারীদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা রাসূলের(সাঃ) হাদীসকে অবজ্ঞা বা বাদ দেওয়ার ধৃষ্টতা প্রদর্শন কখনো সহীহ তরীকা হতে পারে না। আর নারীরা আজকাল কোথায় নেই? সর্বত্র সবখানে অবাধ যাতায়াত নারীদের রয়েছে। নারীরা ইসলামের পর্দার বিধান সঠিক ভাবে মেনে সব বৈধ ও জনকল্যাণমূলক কাজেই অংশ গ্রহণের শরয়ীত বিধান ইসলামে রয়েছে।

সুতরাং তারা মসজিদে নিয়মিত অংশগ্রহণ ও যাতায়াত নিরাপদ করার সংস্কৃতি চালু করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। নিরাপত্তা বা ফেতনা সৃষ্টির ঠুনকো অজুহাত দাঁড় করানোর মাধ্যমে ইসলামের বিভিন্ন বিধান জানা ও মানার মসজিদ ভিত্তিক কার্যক্রমে তাদের বঞ্চিত করার হীন প্রচেষ্টা শুধু আপত্তিকরই নয় বরং ইসলামের অপব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তিকর।  এতে করে নারীরা ইসলামের আলোকে নিজেদের গঠন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিতহচ্ছে। আসুন আমরা রাসূল (সাঃ) এর বাণী ও তার সময়ের নারীদের মসজিদে ও ঈদের সালাতে অংশগ্রহণ সম্পর্কে একটু আলোকপাত করি।
 

রাসূলের যুগে মহিলাদের মসজিদে গমন

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর যুগে নারীরা মসজিদে জামায়াতে সালাত আদায় করার প্রচলন ছিল। নারীরা রাসূলের (সা:) এর যুগে তাঁরই পেছনে মসজিদে নববীতে তাঁর ইমামতিতে নামাজ আদায় করতেন। রাসুলের ওফাত পর্যন্ত এ অনুশীলন অব্যাহত ছিল। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমসহ হাদীসের প্রায় সব গ্রন্থে এ সংক্রান্ত বর্ণনা পাওয়া যায়। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, ‘রাসূল (সা:) ফজর সালাত আদায় করতেন, তখন তাঁর সাথে মুমিন নারীরা চাদর পেঁচিয়ে নামাজ আদায় করতেন, তারপর তারা ফিরতেন, তাদেরকে কেউ চিনতে পারতো না।’ এ  হাদীসটি সহীহ বুখারীতে তিনটি অনুচ্ছেদে উল্লেখিত হয়েছে। [বুখারী, খ. ১, পৃ. ৯৯; পৃ. ২০৮,খ. ৩, পৃ. ১৩০-১৩১] রাসূল (সা) অধিকাংশসময়ে সালাত দীর্ঘ করতে চাইতেন কিন্তু মহিলাদের শিশুদেরকান্নায় তাদের মায়েরা অস্থির হয়ে পড়ে কিনা এ কথা ভেবে তিনিসালাত সংক্ষিপ্ত করতেন। আব্দুল্লাহ ইবনু আবি কাতাদা তদীয়পিতা হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, রাসূল (সা:) বলেছেন, আমি সালাতে দাড়িয়ে তা দীর্ঘ করতে চাই; কিন্তু শিশুর কান্নাশুনে আমার সালাত সংক্ষিপ্ত করি, পাছে তার মায়ের কষ্ট হয়। বুখারী সালাত অধ্যায়ে চারটি স্থানে এ বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন; দুটি আবু কাতাদাহ (রা:) হতে আর দুটি আনাস ইবনু মালিক(রা:) হতে। [বুখারী খ.১, পৃ. ১৭২; পৃ. ২০৮; তিরমিযি খ.১, পৃ. ২৩৪]  প্রথমদিকে মুসলিমরা নিদারুণ অনটনে ছিলেন। এমনকি তাদের অনেকের দুটো কাপড়ও ছিল না। এজন্য অনেককে একপ্রস্থ কাপড় কোনমতেই পেঁচিয়ে সালাত আদায় করতে হতো। এ ব্যাপারটা ভাবলে ও গভীরভাবে অনুধাবন করলেই বুঝা যায় যে, কাপড়ের সঙ্কটও নারীদের সালাত আদায়ের জন্য মসজিদে গমন থেকে বিরত রাখতে পারে নি। পরকালে নারী-পুরুষ সবাইকে যেহেতু জবাবদিহীর কাঠগড়ায় দাড়াতে হবে, নারী কেন সেখানে পিছিয়ে থাকবে। আর এটাই বাস্তব সম্মত ও সঠিক।

রাসূলের যুগে নারীদের সালাত আদায়ের পদ্ধতি

পুরুষরা সামনে ও মহিলারা পেছনে সালাত আদায় করতেন। মহিলাদের কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল পুরুষরা সেজদা হতে পূর্ণরূপে মাথা তোলার পর যেন তারা মাথা উঠায়। সাহল ইবনু সাদ (রা:) বলেন, রাসূল (সা:) এর সাথে লোকজন সালাত আদায় করতো, সংক্ষিপ্ত হওয়ায় তারা তহবন্দ ঘাড়ে বাঁধতেন। আর তাই নারীদেরকে বলা হলো, তোমরা মাথা তুলবে না পুরুষরা সোজা হয়। [বুখারী, খ.১, পৃ. ১৯৭; মুসলিম, খ. ১,পৃ. ৩৩৭] কোনো কোনো বর্ণনায় দেখা যায় নারীদেরকে দেরীতে মাথা তোলার নির্দেশ রাসূল (সা:) নিজেই দিয়েছিলেন। [আল-মুহাল্লা, খ. ৩, পৃ. ১৩১] এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে নারীদের কাতার বা সারি পুরুষের পেছনে ছিলো। পাশাপাশি এটাও প্রমাণিত হয় যে, রাসূলের (সাঃ) আমলে নারীরা মসজিদে জামায়াতে সালাত আদায় করতেন। জামায়াতে সালাত শেষে নারীরা খুব দ্রূত বাসায় ফিরতেন। রাসূল (সা:) নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা রোধ করার জন্য এ পন্থা গ্রহণ করেছেন। যেমন উম্মু সালামা হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা:) যখন সালাম ফেরাতেন, নারীরা উঠে দাড়াতো, দাঁড়ানোর আগে তিনি নিজ স্থানে কিছুক্ষণ অবস্থান করতেন। [বুখারী, খ. ১ পৃ. ২০৪,২০৭,২০৮,২০৯] জহুরী বলেন, আমরা মনে করি আল্লাহ তায়ালা আরো ভালো জানেন; তিনি এ জন্য তা করতেন যেন বাসায় ফেরার আগে মহিলাদেরকে কোন পুরুষ নাগাল না পায়।

নারীদের মসজিদে গমনে বাধা দিতে রাসূলের নিষেধাজ্ঞা

মহানবী (সাঃ) এর আমলে নারীদের সালাত আদায়ের জন্য মসজিদে সরব উপস্থিতি ছিলো । এমনকি রাসূল (সাঃ) নিজেই  নির্দেশনা দিয়েছেন মসজিদে জামায়াতে সালাত আদায় করতে যেতে চাইলে নারীদেরকে বাধা দেয়া যাবে না। কারণ নারীরা আল্লাহর বাঁদি; আর মসজিদ আল্লাহর ঘর। আল্লাহর ঘরে তার বাদীদেরকে যেতে বারণ করা উচিত নয়। তবে তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন তারা যেন সুগন্ধি মেখে, সৌন্দর্য ছড়িয়ে মসজিদে না যায়। কারণ এতে এবাদত এর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। আল্লাহর সমীপে আত্মসমর্পণ ও কাকুতি-মিনতি করার পরিবেশ বিনষ্ট হবে। নিম্নে কিছু হাদীস উল্লেখ করা হল।

১। তোমাদের কারো স্ত্রী মসজিদে গমনের অনুমতি চাইলে সে যেন বাঁধা না দেয়। [বোখারী, খ,১, পৃ. ২০৯] 
২। তোমাদের কারো স্ত্রী যদি মসজিদে গমনের অনুমতি চায় তবে সে যেন তাকে মানা না করে। [মুসলিম, খ. ১,পৃ. ৩৩৮]
৩। আল্লাহর বাদীদেরকে আল্লাহর মসজিদে গমনে বাধা দিও না। [মুসলিম, খ. ৪,পৃ. ১৬২, আল-মুহাল্লা, খ,৩, পৃ. ১২৯] আরেক বর্ণনায় রাসূল (সাঃ) নারীদেরকে মসজিদে গমনের অধিকার হতে বঞ্চিত করতে নিষেধ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন,
৪। মহিলারা তোমাদের কাছে অনুমতি চাইলে তাদেরকে মসজিদে গমনের অধিকার হতে বারণ করোনা। [মুসলিম, খ. ১,পৃ. ৩৩৯]
৫। মহিলাদেরকে রাতে মসজিদে ভ্রমণের অনুমতি দাও। [বুখারীখ. ১, পৃ. ২১৪]

ইবনু হাজার বলেন, রাতে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বেশি থাকে।রাতেই যদি মহিলাদেরকে মসজিদে গমনের অনুমতি দেয়া হয়,দিনে কোন বাধা থাকার প্রশ্নই আসেনা। কেউ কেউ কোন দুষ্ট লোকদের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার অজুহাতে মহিলাদেরকে বারণ করার যে মতপ্রকাশ করেন তা যুক্তিযুক্ত নয়। রাতের আধারে অঘটন ঘটার যে আশঙ্কা থাকে দিনে বহু লোকের উপস্থিতির কারণে তা কম থাকে। এটাই বাস্তব সত্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নারীদের সালাত আদায়ের প্রসঙ্গ আসলে ফিতনা ও নারীদের নিরাপত্তার কথা তোলা হয়, অন্য সকল ক্ষেত্রে নারীদের সরব উপস্থিতির ক্ষেত্রে চুপ কেন? নারীদের অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার খোদাপ্রদত্ত মীরাসী সমাপত্তি হতে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষেত্রেও এ শ্রেণীটা চুপ থাকে। আবার নারীরা যাতে নিরাপদে মসজিদে যাতায়াত করতে পারে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভাবে নারী বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে তারা বধির ও বোকা থাকে।


রাসূলের খলিফাদের যুগে নারীদের মসজিদে সালাত আদায়
রাসূলের (সাঃ ) খলিফাদের যুগেও নারীদের সালাত আদায়ের জন্য মসজিদে গমনের এই ব্যবস্থা বহাল ছিল। ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বক্বর (রা:) এর যুগে মুসলিম নারীরা নিয়মিত জামাতে শরীক হয়ে সালাত আদায় করতেন। হযরত উমার (রা) মহিলাদের মসজিদে গিয়ে সালাত আদায়ের জন্য পৃথক মসজিদের দরজার ব্যবস্থা করেন। নারীদের মসজিদে গমন করে জামায়াতে শরিক হতে তিনি ব্যক্তিগত ভাবে পছন্দ না করলেও তিনি কাঁর স্ত্রীকে মসজিদে যেতে বারণ করেন নি। তাঁর স্ত্রী আতিকা সালাত আদায়ে মসজিদে যেতেন। অপছন্দনীয় হওয়ার পরও উমার (রাঃ) নিজের স্ত্রীকে বাধা দেননি। কারণ তিনি নিজের পছন্দ অপছন্দের উপর রাসূল (সাঃ) এর অভিপ্রায়কে অগ্রাধিকার দিতেন। আর এ চেতনাটাই সঠিক ও যথাযথ। নারীদের মসজিদে গমনের বাধা দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করায় ইবনু উমার (রাঃ) তাঁর পুত্রকে শাসন করেছিলেন। যে সব সাহাবী রাসূলের (সাঃ) এর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন ইবনু উমার (রাঃ) তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। রাসূল (সাঃ) নারীদেরকে মসজিদে গমনের অনুমতি সংক্রান্ত হাদীসটি তিনি বর্ণনা করেছেন। তার এক পুত্র এ হাদীস জানা থাকা সত্ত্বেও প্রাসঙ্গিক অবস্থার বিচারে নারীদের মসজিদে গমনে বাধা দেওয়ার সংকল্প করলে তিনি তাকে শাসন করেছিলেন। এ সংক্রান্ত হাদীসটি সহীহ মুসলিমে কিতাবুস সালাত অধ্যায়ে খ.১, পৃ. ৩৩৮ এ এসেছে। যে যুক্তিতে তিনি নারীদেরকে মসজিদে যেতে বারণ করেছিলেন সে বিবরণও আছে কতক বর্ণনায়। তা হলো-‘তাহলে তারা ফাসাদ সৃষ্টি করবে।’—পুত্রের এ আশঙ্কা যৌক্তিক হলেও ইবনু উমার তাকে শাসন করেছিলেন। কারণ রাসূলের সুস্পষ্ট নির্দেশনার বিপরীতে কোনো যুক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া যায় না। আর এটাই নির্ভেজালভাবে রাসূলের প্রতি আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এ ঘটনার পর পুত্রটির সাথে ইবনু উমার (রাঃ) আমৃত্যু কথা বলেন নি। খুব সম্ভবত এ ঘটনার অব্যবহিত পরে তাদের একজনের মৃত্যু হয়। [মুসলিম, খ.১, পৃ. ৩৩৮-৩৩৯] এ জন্য শাইখ উসাইমিন ইবনু উমার ও তদীয় পুত্রের ঘটনাকে উল্লেখ করে দাবী করেছেন যে, এটি অবশ্যই পালণীয় নির্দেশ। নারীকে নিষেধ করা হারাম হবে। [আশশারহুল মুমতি আলা যাদিল মুসতাকনি, খ. ৪, পৃ. ২৮৪]

নারীদের ঈদের নামাজে অংশগ্রহণ
রাসূলের (সাঃ) যুগে মহিলারা ঈদের নামাজে অংশগ্রহণ করতেন।জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ঈদুল ফিতরের দিন নবী করিম (সা:) সালাত আদায়ের উদ্যোগ গ্রহণ করলেন, প্রথমে সালাত আদায় করলেন, তারপর খুতবা দিলেন।ভাষণ শেষে মিম্বর থেকে নেমে তিনি মহিলাদের কাছে আসলেন,অতঃপর তাদেরকে উপদেশ দিলেন, এ সময় তিনি বেলালের(রা:) হাতে ভর দিয়েছিলেন। আর বেলাল (রা:) কাপড় মেলে ধরেছিলেন, যাতে নারীরা সাদাকা দিচ্ছিলেন। আমি [ইবনে জুরাইজ] ‘আতাকে বললাম: [নারীরা কি] সাদাকা ফিতরা [আদায় করছিলেন]? আতা বললেন, না, এটি ছিল ওই সময় দানকৃত বিশেষ সাদাকা; রমণীরা নিজেদের আংটি খুলে দিচ্ছিলেন। আমি বললাম, বর্তমানে ইমামের কি উচিত হবে মহিলাদেরকে উপদেশ দেয়া? তিনি বললেন, এটি তাদের কর্তব্য,কেন তা তারা তা করবে না? [বোখারী, খ.১, পৃ.২৩৪] হাদীসটি কমপক্ষে ছয়টি স্থানে বুখারীতে উল্লেখ করা হয়েছে। চারটিতে ইবনে আব্বাস (রা:) হতে বাকী দুটিতে জাবির বিন আব্দিল্লাহ (রা:) হতে।
​এই হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, রাসুল (সা:) এর যুগে নারীরা ঈদের নামাজে অংশগ্রহণ করতেন। নারীদের উদ্দেশ্যে রাসুল (সা:) দ্বিতীয় বার বিশেষ ভাষণ প্রদান করেছেন। এতে প্রমাণিত হয় মহিলারা পুরুষদের কাছ থেকে পৃথক হয়ে কিছুটা দূরত্বে অবস্থান করতেন। নারীদের ঈদের সালাতে অংশ গ্রহণকে রাসূল (সা:) খুবই গুরুত্ব দিতেন। এমন কি রাসুল (সা:) ঋতুবতী নারীদেরকেও ঈদগাহে যাওয়ার নির্দেশ দিতেন। শিরীন তনয়াহাফসা বলেন, আমরা আমাদের মেয়েদেরকে ঈদের দিন বের হতে বারণ করতাম। একবার এক মহিলা এসে বনি খালাফের প্রাসাদে উঠলেন। তিনি বর্ণনা করলেন যে, তার ভগ্নিপতি রাসূলের (সা:)সাথে বারোটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। তম্মধ্যে ছয়টি যুদ্ধে তার বোন স্বামীর সাথে ছিলেন। তিনি [আগন্তুক মহিলার বোন]বলেন, আমরা রোগীদের দেখাশোনা করতাম আর আহতদের সেবা করতাম। তিনি রাসূল (সা:) কে জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের কারো যদি জিলবাব [বড় চাদর] না থাকে, তার বের না হওয়ায় কি কোন অসুবিধা আছে? তিনি বললেন, তার সঙ্গিনী যেন স্বীয় চাদর দিয়ে বান্ধবীকে ডেকে নেয়। তাদের [মহিলাদের] উচিত কল্যাণময় কাজ ও মুমিনদের দোয়ার স্থানে উপস্থিত থাকা। হাফসা বলেন, উম্মুল আতিয়া যখন আসলেন, আমি তার কাছে গেলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি এই ব্যাপারে কিছু শুনেছেন? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। আমার পিতা উৎসর্গিত হোক, আতিয়া রাসুল (সা:) এর নাম উচ্চারণ করলেই বলতেন, তার জন্য আমার পিতা উৎসর্গিত হোক, রাসূল (সা:) বলেছেন,সাবালিকা তরুণীও পর্দাশীনরা [অথবা সাবালিকা পর্দানশীন তরুণীরা, আইয়্যুব সন্দেহ করেছেন] এবং ঋতুবতী রমণীরা যেন বের হয়; তবে ঋতুবতীরা নামাজের স্থান হতে দূরে থাকবে। তারা যেন কল্যাণের কাজ ও মুমিনদের দোয়ার স্থলে হাজির হয়। হাফসা বলেন, আমি তাকে বললাম, ঋতুবতীরাও? তিনি বললেন, হ্যাঁ, কেন নয়? ঋতুবতী নারী কি আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত হয় না? তারা কি এটাতে ওটাতে যায় না? [বোখারী, খ.১, পৃ. ৮৪,২৩৩,২৩৫] এই হাদীসে বেশ কিছু নির্দেশনা পাওয়া যায়। বড় চাদরে শরীর আবৃত না করে নারীদের বের হওয়া নিষেধ। ইবাদত ও কল্যাণময় কাজে নারীদের অংশ গ্রহণ করা উচিৎ। ঋতুবতী নারীরাও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকবে না। কল্যাণময় কাজের স্থান, যিকর ও জ্ঞানার্জনের আসরে যেতে তাদের কোনো বাধা নেই।

আমাদের দেশে নারীরা ঈদ ও সালাতে অংশ গ্রহণ মনোভাব

আমাদের দেশে এক দল আলেম মনে করেন, নারীদের মসজিদে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে ফিতনা বিস্তারের কোনো প্রয়োজন নেই। তাদের মতে, ইবাদত পালনের উদ্দেশ্যে বের হয়ে অনাসৃষ্টি মেনে নেওয়া যায় না। বাস্তব কথা হলো নারীদের ক্ষেত্রে এ মনোভাবা পোষণ করা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পড়ে। এতে নারী জাতিকে খাটোও হেয় করা হয়। রাসূল (সাঃ) নালীদের মসজিদে যাওয়ারঅনুমতি দিতে বলেছেন, তিনি তাদেরকে  এমনকি ঋতুবতী রমণীকেও ঈদগাহে উপস্থিত হয়ে মুসলিমদের কল্যাণ কামনায় শরীক হতে বলেছেন। এ নির্দেশনাসমূহ কোনোটি কাল বা যুগসংশ্লিষ্ট নয়। ধর্ষণের চেয়ে মারাত্মক ফেতনা আর হতে পারে না। রাসূলের (সাঃ) এর যুগে মসজিদে সালাত আদায় করতে গিয়ে নারী ধর্ষিত হয়েছেন। তবুও তিনি নারীদের মসজিদে যেতে বারণ করেননি। ফিতনার আশঙ্কায় নারীদেরকে মসজিদে গমনে বাধা দেওয়া সমীচীন হবে না। দুয়ার বন্ধ করলে প্রলয় থামে না। নারীদের মসজিদে গমনে বাধা দেওয়া ফেতনা দূর করার উপায় নয়। নারী আজ সবখানে সবক্ষেত্রে সব জায়গায়। এমতাবস্থায় শুধু মসজিদে গমনে বাধা দেওয়া মোটেও যৌক্তিক হবে না। বর্তমান যুগে নারীরা মসজিদে যেতে পারবে কিনা’ এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হয়ে শাইখ বিন বায বলেন, এই যুগে এবং অন্য যুগেও মসজিদে নারীদের সালাত আদায় বৈধ। [বিন বায ও পরিষদ, ফাতওয়া, খ. ৭, পৃ. ৩৩৩] যারা ‘নারীদের ঘরে সালাত আদায়করা উত্তম’ বলে দাবী করার হাদীস বলেন [তোমাদের স্ত্রীদেরকেমসজিদে যেতে মানা করো না; তবে ঘরই তাদের জন্য উত্তম’ আবুদাউদ,খ. ৪, পৃ. ১৬২] বিখ্যাত হাদীস বিশারদ আল্লামা আলবানী হাদীসটিকে তাদলীসের অভিযোগ করেছেন। বাড়ীতেও কক্ষে সালাত আদায় করা উত্তম সংক্রান্ত হাদীসটির ব্যাপারে ইবনু হাযম আপত্তি তুলেছেন। আলবানী হাদীসটিকে হাসান লিগায়রিহী বলেছেন। সুতরাং নারীদের ঈদের সালাতে ও মসজিদে সালাত আদায় করার ব্যবস্থা থাকা উচিৎ। নারীদের জন্য পৃথক প্রবেশদ্বার ও অযুখানা ব্যবস্থা করে তাদের মসজিদে গমনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এতে ইসলামের মৌলিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ নারীদের বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের বহু স্থানে এ ব্যবস্থা হলেও এখনো সর্র্বত্র হয়নি। পৃথিবীর সকল দেশে মসজিদে নারীদের অংশ গ্রহণের যাবতীয় ব্যবস্থা রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সঠিকভাবে দ্বীন বুঝার তাওফিক দিন। আমীন।

লেখক : পিএইচডি গবেষক, ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

ads