ঘৃণা নয়, ভালোবাসায় বাঁচতে চাই


শর্মি ভৌমিক

আমি ধর্ম বিষয়ে মাঝেমধ্যে লেখালেখি করি বলে ফেসবুক ফ্রেন্ড’দের কেউ কেউ আমাকে এ বিষয়ে না লিখতে অনুরোধ করেন। কেউ কেউ আবার ধর্ম বিদ্বেষী মনে করে থাকেন। কেউ কেউ হয়তো নাস্তিকও ভাবেন। আসলে, এটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। সকলেরই চিন্তা-ভাবনার স্বাধীনতা রয়েছে। প্রতিটি মানুষই ভিন্ন। তাদের মতও ভিন্ন হবে এটাই স্বাভাবিক।

তাদের সেই ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, সৃষ্টির শুরুতে ধর্ম ছিল না। পৃথিবী সৃষ্টির বহু বহু বছর পর মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে এবং সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের জন্য ধর্ম সৃষ্টি করেছে। লক্ষ-কোটি বছরের পৃথিবীতে মানুষই প্রথম আগুন জ্বালাতে সক্ষম হয়েছে। উলঙ্গ মানুষের লজ্জা নিবারণ করতে মানুষই পোশাক-পরিচ্ছদ আবিষ্কার করেছে। একে একে ঘর-বাড়ি, দালান-কোঠা, বিদ্যুৎ, লঞ্চ-জাহাজ, উড়োজাহাজ, পারমাণবিক অস্ত্র, গোলাবারুদ ও আজকের কম্পিউটার, ফেসবুক এবং দৈনন্দিন জীবনের যাবতীয় সবকিছু মানুষকেই আবিষ্কার তথা সৃষ্টি করতে হয়েছে তাদেরই প্রয়োজনে। এ সুন্দর পৃথিবীকে একদিনে কেউ যাদুমন্তর দিয়ে সুন্দর করে দেয়নি। একে সুন্দর করে তুলতে মানুষকে হাজার হাজার বছর শ্রম দিতে হয়েছে, গবেষণা করতে হয়েছে।

আমি ধর্মের বিপক্ষে নই। নাস্তিকও নই। স্রষ্টাকে অবিশ্বাস করার মত জ্ঞান বা বুদ্ধি এখনও আমি আহরণ করতে সক্ষম হইনি। তবে, স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে নিয়ে অনেক চিন্তা করি। তাঁর রহস্য ভেদ করার ইচ্ছে জাগে মনে। নাস্তিকতা কারো কাছে ফ্যাশন মনে হতে পারে কিন্তু আমার কাছে নয়। প্রকৃত নাস্তিক হওয়া খুব সহজ বলে মনে হয় না আমার কাছে। তেমন হতে গভীর ভাবুক কিংবা দার্শনিক হতে হয়। সাধারণ চিন্তার মানুষের পক্ষে প্রকৃত নাস্তিক হওয়া অসম্ভব।

বেশ কয়েকটি ধর্মগ্রন্থ পাঠ করেছি আমি। সেগুলো ঘেঁটে যা দেখেছি তাতে মনে হয়েছে সেসবের হর্তাকর্তা যেন স্বয়ং পুরুষেরা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীদেরকে অচ্ছুত ও অস্পৃশ্যা হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। তবে কী স্রষ্টা পক্ষপাতী? তা কী করে হয়! এ জগতের সব সৃষ্টিই তো তাঁর, তিনি পক্ষপাতী হতেই পারেন না, এ আমার বিশ্বাস। কোন কোন ধর্মে আবার কিছু ক্ষেত্রে নারীদেরকে সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আবার তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়াও হয়েছে। ধর্মগ্রন্থের এসব সিদ্ধান্তগুলো দ্যোতনায় ভরপুর।

বিষয়টি চোরকে চুরি করতে এবং গৃহস্থকে সজাগ থাকতে বলার মতই। তাই, ধর্মের নামে যেকোন বৈষম্যকে আমি মনেপ্রাণে ঘৃণা করি। নারীদেরকে ঘরবন্দী রাখার চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে আমাদের। কোন অজুহাতেই তাদেরকে দাবিয়ে রাখা চলবে না। নারী, পুরুষ উভয়কেই শালীনতা বজায় রাখা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।

এটি নিজেদের সম্মানের জন্যই প্রয়োজন। তার অর্থ এই নয় যে, নারীদের চেহারা দেখা পাপ হয়ে যাবে কিংবা সেক্ষেত্রে নারীরা পাপী হয়ে যাবে। স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার সকলেরই আছে। সেই স্বাধীনতা ধর্ম কিছুতেই কেড়ে নিতে পারে না।

কোন ধর্ম অন্য ধর্মকে কটাক্ষ করবে এটি আমি কখনোই চাই না, মেনে নিতে পারি না। যখন কোন একটি ধর্ম তার নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন সে ধর্মকে শ্রদ্ধা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আবার কোন ধর্ম তার নিজ ধর্মের বাইরে যখন চিন্তা করার সুযোগ রাখে না, তখন সে ধর্ম সম্পর্কে মনে সন্দেহ জাগে। সেই ধর্মকে প্রচন্ড সংকীর্ণ মনে হয় আমার কাছে।

অন্য ধর্মের লোক হলেই তাকে অশুদ্ধ বা অশুচি মনে করা ধর্মের কাজ হতে পারে না। ধর্ম হবে উদার। ধর্ম কাউকে ছোট করবে না, কাউকে গালাগাল দেবে না। সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকাই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত। অথচ, আমরা কী দেখছি!

যে সরিষা ভূত তাড়াবে সে সরিষাতেই ভূত বসে আছে! মানুষের মাঝে বৈষম্য করতে ধর্ম যেন অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছে! অন্য ধর্মের কথা বাদেই নিজধর্মের মানুষের মাঝেই ভেদাভেদ করতে রকেটের গতিতে এগিয়ে চলেছি আমরা!

মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভালো কিছু দিতে পারে না মানুষকে। দেয়ার মধ্যে দেয় শুধু ঘৃণা, হানাহানি ও রক্তপাত। এসব একেবারেই কাম্য নয়। সুন্দর পৃথিবীকে আরোবেশি সুন্দর করে তুলতে হলে প্রয়োজন শুধু মানুষে মানুষে ভালোবাসা, মানুষে মানুষে একাত্মতা।

জীবনটা একটা সংক্ষিপ্ত জার্নি মাত্র। একে জটিল ধাঁধায় বাঁধতে নেই। যত পারবেন আনন্দ করুন। আনন্দে বাঁচাটাই মূল কথা। আনন্দহীন জীবন, জীবন নয়। সততায় আনন্দ হাসে প্রফুল্ল হয়ে। সৎ হয়ে বাঁচলে আনন্দময় জীবনের দেখা মেলে। কাউকে ঠকালে নিজেকেই ঠকতে হয়। এর প্রমাণ আমরা কম-বেশি সকলেই পেয়ে থাকি জীবনে।

ধর্মকর্ম যার যার ব্যক্তিগত বিষয়। এটা কারো উপর চাপিয়ে দেয়া চলে না। মানুষ পরিবার থেকেই প্রথম শিক্ষা গ্রহণ করে। একটি পরিবারই পারে শিশুকাল থেকে নৈতিক শিক্ষায় শিশুকে গড়ে তুলতে। শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। লেখাপড়া শিখে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারলে আমাদের অন্তর্দৃষ্টি খুলে যায়। তখন আমরা নিজেরাই বুঝতে সক্ষম হই কোনটা যৌক্তিক আর কোনটা যৌক্তিক নয়। নিজের বুদ্ধি ও যুক্তি খাটালেই মানুষ সঠিক, বেঠিক নির্ণয় করতে পারে।

যুক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ সত্য আবিষ্কারে। প্রত্যেককে সত্যকে মেনে নেয়ার ক্ষমতা অর্জন করা দরকার। তবেই অন্ধবিশ্বাস দূরীকরণ সম্ভব হবে আমাদের।

প্রতিদিন আমি স্বপ্ন দেখি মানবিক সুন্দর এক পৃথিবীর। ক্ষুদ্র এ জীবনে হানাহানি, যুদ্ধ ও সংঘাত আর চাই না। এই স্বল্প সময়ে মানুষের ভালোবাসাকে পাথেয় করে পথ চলতে চাই। চাই ভালোবাসা দিয়ে পৃথিবীকে ভরিয়ে দিতে।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

রেদওয়ানুল/আওয়াজবিডি

ads