ব্রাদারকে মারধর ও গুলি করে হত্যার হুমকির প্রতিবাদে কর্মবিরতি

এক সময়কার টোকাইর কাছে জিম্মি পুরো হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা


হৃদয়

টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের এক সিনিয়র ব্রাদারকে মারধর ও গুলি করে হত্যার হুমকির অভিযোগ উঠেছে টঙ্গীর কো-অপারেটিভ ব্যাংক মাঠ বস্তির এক সময়কার টোকাই ও বর্তমানে হাসপাতালের আউট সোসিং কর্মচারী তৌহিদুল ইসলাম হৃদয়।

এরই প্রতিবাদে রোববার দুপুরে হাসপাতালের সকল ব্রাদার, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মবিরতি পালন ও প্রতিবাদ সভা করে। এতে করে হাসপাতালে আসা রোগীরা চিকিৎসা সেবা না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন।

প্রতিবাদ সভায় ব্রাদার ও নার্সরা জানান, হাসপাতালের আউট সোর্সিং-এর কর্মচারী তৌহিদুল ইসলাম হৃদয় বহিরাগত কয়েকজন সন্ত্রাসী নিয়ে গত শনিবার বিকেল ৩ টায় জরুরি বিভাগে ব্রাদার ও নার্সদের রুমে গিয়ে তার নির্দেশ মত হাসপাতালে কাজ করার জন্য বলে। এতে জরুরি বিভাগের সিনিয়র ব্রাদার মশিউর রহমান তার কথার প্রতিবাদ করলে তাকে দুই দফা মারধর করে এবং বলে এই হাসপাতাল আমার, আমি মন্ত্রীর লোক, আমার নির্দেশ মতো কাজ না করলে “কোমরে থাকা পিস্তল দেখিয়ে” বলে, এখানে সবাই আমার কথা শোনে, তুই আমার কথা না শুললে, গুলি করে মেরে ফেলব।

এঘটনার পর ব্রাদার মশিউর রহমান বাদি হয়ে তৌহিদুল ইসলাম হৃদয়সহ শাওন ও শুভ’র নাম উল্লোখ করে টঙ্গী পুর্ব থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। বিষয়টি হাসপাতালের ব্রাদার, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে জানাজানি হয়ে পড়লে সকলের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে রোববার সকাল ১০ টা থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত হাসপাতালে কর্মরত ব্রাদার, নার্স, ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ২ ঘন্টা কর্মবিরতি পালন এবং প্রতিবাদ সভা করে।

হাসপাতালে জরুরি বিভাগের সিনিয়র ব্রাদার মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সরকারি কর্মচারী হয়েও অশিক্ষিত একজন আউট সোর্সিং কর্মচারীর কাছে প্রায়ই আমাদের ব্রাদার ও নার্সদের শারীরিকভাবে লাঞ্চিত হতে হয়। হাসপাতালের নারী নার্সরাও এই হাসপাতালে নিরাপদ নয়। হৃদয় নিজেকে মন্ত্রীর লোক এবং হাসপাতালের কর্ণধার দাবি করে যা নয় তাই করছে !

হাসপাতালের বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে অসদাচরণের বিষয়টি ইতিপূর্বে স্থানীয় মন্ত্রী মহোদয়কে জানানো হয়েছে। এসব বিষয়ে কোন প্রতিকার না পেয়ে আমরা অনেকেই হতাশ হয়েছি। একজন আউট সোর্সিং কর্মচারীর কাছে হাসপাতালে কর্মরত আমরা সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর জিম্মি হয়ে পড়েছি, এভাবে চাকরি করা যায় না।

তৌহিদুল ইসলাম হৃদয়কে হাসপাতাল থেকে বিদায় না করা হলে, আমাদের অন্যত্র বদলি করা হোক নয়তো আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
সিনিয়র নার্স সালমা আক্তার জানান, গত ৫ মার্চ আমার চাকুরি সংক্রান্ত একটি বিভাগীয় বিষয়কে কেন্দ্র করে তৌহিদুল ইসলাম হৃদয় আমাকে হাসপাতালের একটি কক্ষে আটকে রেখে ৬ লাখ টাকা মুক্তিপন দাবি করে।

টাকা না দিলে আপত্তিকর ছবি মোবাইল ফোনে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করবে বলে আমার পরিবারকে জানায় এবং বাড়ি ভিটে বিক্রি করে টাকা এনে দিনে দিতে বলে। এক পর্যায়ে সে তার বাহিনী খবর দিয়ে এনে আমাকে শ্লীলতাহানী করার জন্য তাদের হাতে তুলে দেয়ার চেষ্টা করে। পরে আমার পরিবার পুলিশে খবর দিলে টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ আমাকে প্রায় সাড়ে ৬ ঘন্টা পর উদ্ধার করে।

এব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে হাসপাতালের আউট সোর্সিং কর্মচারী তৌহিদুল ইসলাম হৃদয় বলেন, তার বিরুদ্ধে টাকা দাবি, মারধর ও গুলি করে হত্যার হুমকির ঘটনা মিথ্যা। এপর্যন্ত হাসপাতালে কউকে কখনও মারধরতো দুরের কথা রাগ করে কথাও বলিনি। আমাকে হাসপাতাল থেকে সরানোর জন্য এসব করা হচ্ছে বলে দাবি করেন হৃদয়।

এবিষয়ে হাসপাতালের আবাসিক অফিসার ডা. পারভেজ হোসেনের কাছে জানতে চাইলে, তিনি রহস্যজনক কারণে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, এব্যাপারে তত্ত্বাবধায়কের সাথে কথা বলুন। আমি কিছু বলতে পারব না। পরে তিনি দ্রুত হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যান।

এব্যাপারে টঙ্গী শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. নিজাম উদ্দিন বলেন, পূর্বের কোন বিষয় আমার জানা নেই। তবে এই মাত্র একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে দেখছি কি করা যায়।

টঙ্গী পুর্ব থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) মু. আমিনুল ইসলাম জানান, একটি অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, টঙ্গী শহীদ আহসান উল্লাহ মাষ্টার জেনারেল হাসপাতালের আউট সোর্সিং কর্মচারী হিসেবে তৌহিদুল ইসলাম হৃদয়ের কোন সরকারী আদেশ না থাকলেও জোরপূর্বক ওয়ার্ড মাষ্টার পদবী গ্রহণ করে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে হাসপাতাল অভ্যন্তরে একের পর এক অনৈতিক কর্মকান্ড ঘটাচ্ছে। গত বছর ৮ সেপ্টেম্বর সে বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানীর ৩ বিক্রয় প্রতিনিধিকে পিটিয়ে আহত করে, হাসপাতালের তৎকালীন তত্বাবধায়ক ডা. কমর উদ্দিন ও আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. পারভেজকে ম্যানেজ করে একজন আউট সোর্সিং কর্মচারি রাতারাতি ওয়ার্ড মাষ্টার বনে যায় এবং শহীদ আহসান উল্লাহ মাষ্টার হাসপাতালের নতুন ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষ দখল করে সাজ-সজ্জিত অফিস এবং সেখানে সরকারী টেলিফোন ব্যবহার করে পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া  টোকাই তৌহিদুল ইসলাম হৃদয়।

অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতাল মসজিদ কমিটিতে জোর করে থাকার চেষ্টা, জরুরি বিভাগের সিনিয়র ব্রাদার মোস্তাফিজুর রহমান, ফার্মাসিষ্ট বিউটি আক্তার, হাসপাতালের ডাক্তার, নার্সকে লাঞ্চিত, আউট সোসিং কর্মচারী হয়েও হাসপাতাল মসজিদ কমিটিতে থাকার জন্য মসজিদের টাকা উত্তোলনকারী সাইফুলকে মারধর, তার কথা মত কাজ না করায় প্রধান হিসাব রক্ষক আ: করিমকে বিভিন্ন ধরণে হুমকি দেয়ার একাধিক অভিযোগ রয়েছে তৌহিদুল ইসলাম হৃদয়ের বিরুদ্ধে।

এছাড়াও গত ৬ সেপ্টেম্ব শুক্রবার দুপুরে তৌহিদুল ইসলাম হৃদয় টাকার বিনিময়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে হাসপাতালের নতুন ভবনের ভেতর হাসপাতালের বাবুর্চির মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান করা এবং সেইদিন সন্ধ্যা থেকে উচ্চ শব্দে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে নাচ-গান চালিয়ে শব্দ দূষণের কারণে রোগীরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল।

অনুষ্ঠান মঞ্চের পাশের রুমেই শুয়ে ছিল ডেঙ্গু আক্রান্ত বেশ কয়েকজন রোগী। সেই সময় এনিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলেও কর্তৃপক্ষ রহস্যজনক কারণে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করেনি।

ads