আমরা যেন একদিনের জন্য বাঙালি না হই!

Shah Ahmed Shaj

বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে উন্নত দেশের সাথে বাংলাদেশও এগিয়ে যাচ্ছে। তথ্য প্রযুক্তির যুগে দেশের যে আমূল পরিবর্তন যে হয়েছে সেটা মানতে কোনো দ্বিধা নেই।

আজ দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে ইন্টারনেট ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে টাকা লেনদেন সবকিছুই স্মার্ট ফোন দিয়ে করা যায়। যেমনটি কোনো খবর পেতে হলে টিভি অথবা পরের দিন পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। একটি স্মার্ট ফোন থাকলে বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়।

বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত বা যারা একটু আয়-রোজগার ভালো করছেন তাদের সন্তাদেরও বাংলা মিডিয়ামে না পড়িয়ে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াচ্ছেন।

সবকিছু যেমন পরিবর্তনের ছোঁয়ায় অগ্রসর হচ্ছে তখন আমরা যেন আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে নিজের দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছি। বিগত ৮ থেকে ১০ বছরের চিত্র এমনটাই অনুমেয়। আমরা যেন একদিনের জন্য সবকিছু দিবস বা ইতিহাসের পাতায় লেখা দিনগুলোকে স্মরণ করি।

সেই একটি দিনকে স্মরণ করা বা দিবস পালন করাতে আমার আপত্তি নেই। তবে ওই দিবসে কিছু ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন, তথ্য-প্রযুক্তির যুগে সেলফি, কিছু আড্ডাতে যেন সীমাবদ্ধ।

কিন্তু আমাদের প্রজন্মকে বাংলা শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস না শিখিয়ে ইংলিশ মিডিয়ায় পড়িয়ে যেন শুধু উন্নত দেশে পাড়ি জমানোর স্বপ্নে বিভোর। আর একদিন সন্তানকে নিয়ে দিবস উপলক্ষে বের হলাম কিন্তু সন্তানকে সেই দিনের ইতিহাস, কত ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই বাংলাদেশ এ সম্পর্কে কোনো ধারনাই দিলাম না। এমনকি সন্তান ইংলিশ মিডিয়ামে স্কুলে পড়তে পড়তে নিজ দেশে থেকে বাংলাটাই ভুলে গেছে।

প্রতিবছর আমরা ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২৬শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বর, বাংলা বছরের প্রথম দিন ১লা বৈশাখ ছাড়াও অনেক দিন পালন করি।তবে বিগত কয়েক বছর ধরে আমরা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, টিভি পর্দায় দেখছি এই দিবস উপলক্ষে যতটা না ওই দিনের তাৎপর্য বা বীর নেতাদের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হবে তার চেয়ে বেশি অপসংস্কৃতির ভয়াল থাবায় প্রজন্মের কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সেই দিনগুলো।

জাতির শ্রেষ্ট সন্তানেরা, বীর সেনারা, যে আত্মত্যাগের কারণে এই এক টুকরা লাল সবুজের দেশ উপহার দিলেন বিনিময়ে আমরা তাঁদের বিদেহী আত্মার জন্য মাগফেরাতটুকুও করতে কার্পণ্যতা করি।

দুঃখের বিষয় কোনো দিবস আসলে এখনকার প্রজন্ম বাইরে ফুচকা-চটপটি খেতে যায়! সম্প্রতি দেখলাম সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে।

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ আলাউদ্দীন হোসেনের সাথে শিক্ষার্থীরা হিন্দি গানে নৃত্য পরিবেশন করছে! এ নিয়ে শিক্ষকে নিয়ে অনেক সমালোচনা করছেন। একজন সাংবাদিকও ভিডিওটি ফেসবুকে নিজ ওয়ালে শেয়ার করে লিখলেন, " ভাষার মাসে হিন্দি গানে অধ্যক্ষ আলাউদ্দিন হোসেনের ডান্স। এটা কি খুব জরুরি ছিল?"

এ নিয়ে গণমাধ্যমে অধ্যক্ষ আলাউদ্দিন আলী নিজের এমন কাণ্ডের সাফাই গেয়ে বলেন, ‘বসন্ত বরণ অনুষ্ঠান চলাকালে ছাত্রীরা জোর করে আমাকে স্টেজে টেনে তুলে নিলে আমি একটু নৃত্য করি। এটিতে আমি দোষের কিছু দেখি না।’

তিনি বলেন, যেটা করেছি প্রকাশ্যে ফান (মজা) করেছি। এটি নিয়ে মানুষ কী মন্তব্য করলো তাতে আমার কিছু যায়-আসে না।

সত্যি অধ্যক্ষ আলাউদ্দিন আলীর কথা ধরে যদি বলি তবে আমাদের কারো কিছু যায়-আসে না। আজ আমরা এই সমাজে এমন ভয়াবহ জায়গায় এসে উপনীত হয়েছি যে কে কি বলল, দেশ, সংস্কৃতি, ইতিহাস কোন দিকে গেল এসব নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই। শিক্ষক যেখানে বুঝতে পারছেন না তিনি আগামী প্রজন্মকে কি শিক্ষা দিচ্ছেন,বাবা-মা বুঝতে পারছেন না সন্তানকে কি শিক্ষা দিবেন, রাষ্ট্র পরিচালনাকারীরা যদি এখন কচুরিপানা খাওয়ান তাহলে এই রাষ্ট্র একদিন এমনিতেই তলিয়ে যাবে। আর এই সময় খুবই সন্নিকটে।

নিজের সংস্কৃতির পাশাপাশি আপনি যেকোনো সংস্কৃতি ফলো করতে পারেন। তবে নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে শতভাগ প্রজন্মকে জ্ঞান নির্ভর করে গড়ে তোলা পরিবার-শিক্ষদের কাজ। বাংলা, হিন্দি, স্প্যানিশ অথবা ইংলিশ গান বা সংস্কৃতি ফলো করা এখানে মুখ্য বিষয় নয়। একদিনের জন্য বছরের শুরুতে পান্তা-ইলিশ খেয়ে যেন সংস্কৃতিকে ধরে না রাখি।

আসছে ২১শে ফেব্রুয়ারি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।পাকিস্তানি সরকারি বাহিনীর গুলিতে প্রাণদান করে বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা। সালাম-বরকত-রফিক-শফিক-জব্বার আরও কত নাম না-জানা সেসব শহীদের আত্মত্যাগে আমরা ফিরে পাই আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলা। দিনটি ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ইউনেসকোর ৩০তম অধিবেশন বসে। ইউনেসকোর সেই সভায় একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব পাস হয়। ফলে পৃথিবীর সব ভাষাভাষীর কাছে একটি উল্লেখযোগ্য দিন হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতি পায়। এই মহান দিনে যেন সন্তানদের বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইতিহাস সম্পর্কেও সঠিক তথ্য তুলে ধরি।

আমাদের এতো সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি ধরে রাখলে বাঁচবে দেশ, ব্যাপ্তি হবে ইতিহাস, পরবর্তী প্রজন্ম বাঁচাবে আমাদের এক টুকরা লাল-সবুজের ঐতিহ্য নিয়ে।

লেখক: সাংবাদিক, সম্পাদক।


শাহ আহমদ সাজ
শাহ আহমদ সাজ
https://www.awaazbd.net/author/awaaz-usa

শাহ আহমদ সাজ ১৯৮৭ সালে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় জন্মগ্রহন করেন। শিক্ষা জীবনের শুরু ঢাকার সানরাইজ প্রি ক্যাডেট এন্ড কলেজে। তারপর ২০০৪ সালে কুলাউড়ার জালালাবাদ হাইস্কুল থেকে এসএসসি, ২০০৬ সালে মদন মোহন কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। ২০০৭ সালে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি অনার্সে ভর্তি হন।এরপর ইনফরমেশন টেকনোলজিতে পড়ালেখার জন্য লন্ডনে পাড়ি জমান এবং ক্রাউন ইন্টারন্যাশনাল কলেজে ব্যাচেলর শেষ করেন। বর্তমানে সপরিবারের যুক্তরাস্ট্রে বসবাসরত শাহ আহমদ, ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য ও সৃজনশীল সবধরনের কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। ২০১৬ সাল থেকে আওয়াজবিডি ও সাপ্তাহিক আওয়াজবিডির প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশের দায়িত্ব পালন করছেন।শাহ আহমদ বাংলাদেশ ডন-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।

mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ