অবৈধ পথে ইউরোপে পাড়ি দিচ্ছে সিলেটের তরুণরা, দায়ী বাবা-মা

শাহ আহমদ সাজ

সিলেটকে বলা হয় প্রবাসীদের শহর। বাংলাদেশের  সিলেট বিভাগের বেশিরভাগ বাসিন্দারা প্রবাসে পাড়ি জমান প্রতিনিয়ত। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কয়েক লাখ সিলেট প্রবাসীরা বসবাস করছেন। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে বর্তমানে বৈধ পথের চেয়ে অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।

গত কয়েক বছর ধরে ডলার, পাউন্ডের স্বপ্নে বিভোর তরুণরা অবৈধ পথে ইউরোপ, আমেরিকা পাড়ি দেয়ার মধ্যখানে লাশ হয়ে দেশে ফিরেছে। অনেকে নিখোঁজ হয়ে আজও ফিরেনি। কিন্তু দালালের খপ্পরে পড়ে এই সুন্দর জীবনকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে সপেঁ দিতেও দ্বিধা করেছে না তরুণরা। খবরের শিরোনামে যেখানে প্রতিদিনই লাশের মিছিলের খবর পাওয়া যায় সেখানে আরো বেশি করে ঝুঁকছে তারা! সংখ্যায় খুবই কম যারা দুর্গম যাত্রা পাড়ি দিয়ে স্বপ্নের দেশে পা রাখতে পেরেছেন কিন্তু  বেশিরভাগের স্বপ্নই দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, গেল কয়েক মাসে ইউরোপের স্বপ্নে পা বাড়িয়ে মারা গেছেন সিলেটের অন্তত ২২ তরুণ-যুবক। এছাড়া নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৮ তরুণ। গেল প্রায় ১০ মাস ধরে কোন খোঁজ মিলছে না তাদের। এসব তরুণের পরিবারে এখন ঘোর অন্ধকার।

চলতি বছরের ৯ মে লিবিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলের জুয়ারা শহর থেকে অন্তত ৭৫ জন অভিবাসী নিয়ে ইউরোপের দেশ ইতালির উদ্দেশ্যে সাগর পথে রওয়ানা দেয় একটি বড় নৌকা। অভিবাসীদের মধ্যে প্রায় ৬০ জন ছিলেন বাংলাদেশি। তিউনিসিয়ার উপকূলে ওই নৌকা থেকে অভিবাসীদের ছোট একটি নৌকায় তোলার সময় সেটি ডুবে যায়। এতে নিহত হন অর্ধশতাধিক অভিবাসী। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশি ছিলেন ৩৭ জন; যেখানে অন্তত ২০ জন ছিলেন সিলেট অঞ্চলের। এছাড়া ইউরোপের দেশে যাওয়ার পথে নিখোঁজ রয়েছেন সিলেটের অন্তত ৮ তরুণ।

ভূমধ্যসাগর পথে মরক্কো থেকে স্পেনে যাওয়ার পথে গত সোমবার রাতে নৌকাডুবিতে ৩ তরুণের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে জাকির হোসেন ও জালাল উদ্দিন মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার বাসিন্দা।

উদ্ধার হওয়া আহত এক যুবকের দেয়া সুত্রে জানা গেছে, মরক্কোর নাদুর থেকে নৌকায় করে প্রায় ৭৮ জন তরুণ স্পেনের ম্যালিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। ভুমধ্যসাগরে ইউরোপগামী তরুণবাহী নৌকাটি একসময় সাগরে ডুবে গেলে অনেকেই নিখোঁজ হন। এদের মধ্যে বড়লেখার ২ তরুণসহ ৩ বাংলাদেশি তরুণের মৃত্যু ঘটে।

গুরুতর আহত আরো ৫৯ জনকে দ্বীপ থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নৌকা ডুবিতে এখন পর্যন্ত ১৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। আহত এবং নিখোঁজ থাকা কারোই নাম ঠিকানা এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি ম্যানিলা কর্তৃপক্ষ। তবে এর মধ্যে যে আরো বাংলাদেশি থাকতে পারে সেটা নিশ্চিতভাবে বলা যেতে পারে। কারণ দিনদিন অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। আর এর জন্য দায়ী বাবা-মা। লাখ লাখ টাকা খরচ করে, ঋণের বুঝা মাথায় নিয়ে, ভিটা-মাটি বিক্রি করে সন্তানকে দালালের মাধ্যমে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।

যখন লাশ হয়ে ফিরছে তখন সন্তান হারিয়ে আহজারি করেছন আর দালালকে দোষ দিচ্ছেন। কিন্তু একবার দালালের ফাঁদে পা দেয়ার আগে ভাবছেন না যে আপনার সন্তানকে যে রাস্তায় পাঠাচ্ছেন সেখানে শুধু অন্ধকার। অন্ধকার থেকে আলোর মুখ দেখার সুযোগ খুবই ক্ষীণ।

আজ সংখ্যায় শুধু সিলেটি নয় বাংলাদেশের অনেক জায়গার তরুণরা এখন এই অবৈধ সাগর পথে পা বাড়াচ্ছে।

ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার সময় লিবিয়ার কোস্ট গার্ডের হাতে ধরা পড়ে সর্বশেষ দেশে ফেরত এসেছেন কিশোরগঞ্জের ভৈরবের ১৯ জন তরুণ। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে তাঁরা ভৈরবে এসে পৌঁছান।

২০-২৫ লক্ষ টাকা, কেউ কেউ ৩০-৪০ লক্ষ টাকা দিয়ে আজ নিঃস্ব হয়ে ফিরছে দেশে আর কেউ বা লাশ হয়ে। এসব অবৈধ পথ অবলম্বন না করে সন্তানকে এখনই সময় ভুল পথে পা বাড়ানোর আগে সেই পথ থেকে ফিরিয়ে আনা নয়তো আগামীতে আপনার সন্তানের লাশের খবর আসতে সময় বেশি লাগবে না। তখন সব হারিয়ে আফসোস ছাড়া কিছু করার থাকবে না।

লেখক: সাংবাদিক, সম্পাদক।


শাহ আহমদ সাজ
শাহ আহমদ সাজ
https://www.awaazbd.net/author/awaaz-usa

শাহ আহমদ সাজ ১৯৮৭ সালে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় জন্মগ্রহন করেন। শিক্ষা জীবনের শুরু ঢাকার সানরাইজ প্রি ক্যাডেট এন্ড কলেজে। তারপর ২০০৪ সালে কুলাউড়ার জালালাবাদ হাইস্কুল থেকে এসএসসি, ২০০৬ সালে মদন মোহন কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। ২০০৭ সালে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি অনার্সে ভর্তি হন।এরপর ইনফরমেশন টেকনোলজিতে পড়ালেখার জন্য লন্ডনে পাড়ি জমান এবং ক্রাউন ইন্টারন্যাশনাল কলেজে ব্যাচেলর শেষ করেন। বর্তমানে সপরিবারের যুক্তরাস্ট্রে বসবাসরত শাহ আহমদ, ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য ও সৃজনশীল সবধরনের কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। ২০১৬ সাল থেকে আওয়াজবিডি ও সাপ্তাহিক আওয়াজবিডির প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশের দায়িত্ব পালন করছেন।শাহ আহমদ বাংলাদেশ ডন-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।

mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ