দিল্লী টু সম্রাট টু আবরার এরপর কে?

দিল্লী টু সম্রাট টু আবরার এরপর কে?

বুয়েট বাংলাদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠান হিসেবেই খ্যাত। আর মেধাবী তৈরীর কারখানায় নির্মম পিটুনিতে প্রাণ গেল মেধাবী শিক্ষার্থীর। আর খুন করেছে এই প্রতিষ্ঠানেরই ছাত্রনেতারা। শিক্ষার্থীর অপরাধ সে ভারতের বিরুদ্ধে ফেইসবুকে একটি পোষ্ট দিয়েছিল। কত ভয়ানক কত নির্মম এমন সংবাদ।

বাংলাদেশের নির্মমতার সংবাদ দেখতে দেখতে আমরা যেন অনেকটা পাথর হয়ে গেছি। কিন্তু আবরার ফাহাদ নামের বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থীর এমন করুন মৃত্যুতে আমাদের পাষান হৃদয়ও যেন নাড়া দিয়ে উঠেছে।

আবরার ফাহাদ বুয়েট এর একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। আবরার তার ফেসবুক একাউন্টে লিখেছিলেন-

১. ৪৭ এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোন সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ৬ মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিছিলো। বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মংলা বন্দর খুলে দেওয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ ইন্ডিয়াকে সে মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে।
২. কাবেরি নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েকবছর আগে শিরোনাম হয়েছিল। যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চাই না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড়লাখ কিউবিক মিটার পানি দিব।
৩. কয়েকবছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তরভারত কয়লা-পাথর রপ্তানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দিব। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব।
হয়তো এসুখের খোঁজেই কবি লিখেছেন-

“পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মত সুখ কোথাও কি আছে
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।”

ব্যাস চরম এই সত্য কথাগুলি লিখার কারনেই নির্মমভাবে ছাত্রলীগের হাতে প্রাণ দিতে হলো সম্ভাবনাময় আগামীর একজন প্রকৌশলীর। অথচ এই বিষয়ে ড. তুহিন মালিক স্যারের একটা লেখা ফেইসবুকে ভাইরাল হয়েছে। কই তাঁর বিরুদ্ধে ত কাউকে তেমন টু শব্দ করতে দেখেনি। কারণ তাঁর বিরুদ্ধে জামায়াত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নেই। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আবরার ফাহাদকে যারা মেরেছে তারাই বুক ফুলিয়ে বলছে-শিবির সন্দেহে তাকে আটক করা হয়েছে। অতপর পিটিয়ে হত্যা। ফেইসবুকে ভাইরাল হওয়া ছবিতেও দেখা গেছে ফাহাদের শরীরে মারপিঠের চিহ্ণ। কত নির্মম, কত জঘন্য! এরা কিভাবে বুয়েটে ভর্তি হলো। পিশাচ মনোভাব থাকলেও অন্তত বুয়েটের শিক্ষার আলোয় তাদের পিশাচী মনোভাব দুর হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু না তারা প্রমাণ করেছে-ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙ্গে! মানে ছাত্রলীগ মাত্রই হিং¯্র খুনী। সেটা বুয়েট হোক, চুয়েট হোক, রুয়েট হোক আর মেডিকেল, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় হোক।
আপাত দৃষ্টিতে যদি মেনেও নেই ফাহাদ শিবির করতো। তবুও ভারতের বিরুদ্ধে ঐতিাহাসিক দলিলের ভিত্তিতে বুদ্ধিভিত্তিক লেখা কি অপরাধ! শিবির করলে কি তার মৌলিক অধিকার নেই। কোন রাষ্ট্রে এমন নীতি কখনো কল্পনাই করা যায়না।

আবরার ফাহাদের লেখা পড়ে যার মনে ন্যুনতম দেশপ্রেম আছে সে ই সমর্থন করবে। এই লেখার কারণে যদি তাঁকে শিবির সাব্যস্থ করে হত্যা করা হয় তাহলে প্রমাণ হলো শিবিরের ছেলেরা দেশপ্রেমিক আর ছাত্রলীগ দেশদ্রোহী খুনী। যদিও ফাহাদের পরিবার বলেছে তারা আওয়ামী সমর্থক এবং কুষ্টিয়ার স্থানীয় এমপি আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফের অনুসারী। তবুও ভারতের বিরুদ্ধে লেখার কারণে তাকে খুন হতে হলো নিজেরই ক্যাম্পাসে।

সরকারের বিরুদ্ধে কিংবা ভারতের বিরুদ্ধে লেখার কারণে যে কোন দল-মতের মানুষকে খুন করার লাইসেন্স ছাত্রলীগ পেল কোথায়? যেখানে সারাদেশে সরকারের পক্ষ থেকে ক্যাসিনো দমনে জোরালো অভিযান চলছে। অনেক রতি-মহারতিরা ধরা পড়ছে সেসব অভিযানে। সরকারের এমন অভিযানে সাধারণ মানুষ সরকারের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করছে। এমন সময়ে আবরার ফাহাদকে নিজের ক্যাম্পাসে নির্মমভাবে পিঠিয়ে হত্যা করেছে ছাত্রলীগ।

ইতোমধ্যে খবর এসেছে দুইজন ছাত্রলীগ নেতাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এই খুনের বিচার করতে সরকার কতটা আন্তরিক তা জানতে হয়তো দুএকদিন অপেক্ষা করতে হবে। যদিও বিচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নীতি হলো শক্তের ভক্ত নরমের জম অবস্থা। ইতোমধ্যে বিশ্বজিৎ হত্যা সহ দেশের অনেক আলোচিত নির্মম হত্যাকান্ডে ছাত্রলীগের জড়িত থাকার প্রমাণ থাকা স্বত্তেও তারা শেষ পর্যন্ত শাস্তি থেকে রক্ষা পেয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষ একটি বেশী ইস্যুভিত্তিক ভাইরাল প্রিয়। কোন কিছু পেলে ভাইরাল শুরু করে। নতুন আরেকটা পেলে সেটা একদম ভুলে যায়। এই ধরেন ক্যাসিনো অভিযান কয়দিন ছিল আলোচনায়। এরমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘের অনুষ্ঠানে যোগদান এবং ভারত সফর। বেশামাল পেয়াজের বাজার। দিল্লীর সাথে অসম চুক্তি নিয়ে যখন ফেইসবুকে খুব লেখালেখি হচ্ছিল সেই সময়ে ক্যাসিনোর অন্যতম মুল হোতা যুবলীগ নেতা সম্রাট গ্রেফতার করা হলো। জাতি দিল্লীর কথা ভুলে সম্রাটকে নিয়ে পড়ে থাকলো।সম্রাটকে ইস্যু শেষ হতে না হতেই বুয়েটে আবরার ফাহাদের লাশ পড়লো। অতপর জাতি এখন আবরার ফাহাদকে নিয়ে মেতে উঠেছে। ভোর হলে হয় তো নতুন আরেকটি ইস্যুও জন্ম হবে আমরা ফাহাদকে ভুলে গিয়ে নতুন ইস্যু নিয়ে মেতে উঠবো। কিন্তু একটা প্রশ্ন মনে ঘুরপাক খাচ্ছে- এরপর কোন ইস্যূ আসবে, আর কে ই বা হচ্ছে সেই বলির পাঠা। আপনী আমি না সে!

মিডিয়ার সাথে থাকার সুবাদে দেশে বিদেশে প্রতিনিয়ত যা ঘটে তাই নিয়েই আমাকে ব্যস্থ থাকতে হয়। ইচ্ছা না থাকা স্বত্ত্বেও অনেক বিষয় জানতে হয়, জানাতে হয়। কিন্তু আবরার ফাহাদ দের এমম নির্মম হত্যাকান্ডের সংবাদ দিতে আমাদের বুক কাপেঁ। কারণ আমিও ফাহাদের ৫৬ হাজার বর্গমাইলের দেশের একজন জন্মসূত্রে নাগরিক। অতীতে বাংলাদেশে এমন হত্যাকান্ডের বিচার হয়নি। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে অন্তত ফাহাদ হত্যার সুষ্টু বিচার হবে। একটা কথা ভুলে গেলে চলবেনা। যে ক্ষমতা বড়ই পিচ্ছিল জিনিস আজ আপনী ক্ষমতার জোরে যে অপকর্ম করছেন ক্ষমতার পালা বদলে তা তিন থেকে চারগুন হয়ে আপনার উপর ফিরে আসবে। জিকে শামীম, লোকমান, সম্রাট ও আরমান রা কখনো কল্পনা করেনি নিজেদের সরকার ক্ষমতায় থাকতে তাদের এমন জঘন্য পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

কিন্তু ইতিহাস তাদের সেই চরম বাস্থবতার মুখোমুখি ধার করিয়েছে। এথেকে শিক্ষা নিয়ে অন্তত ক্ষমতাসীনদের একটু সতর্ক থাকা উচিত। শুধু ক্ষমতা নয় বিবেককে খাটিয়ে নিজেকে ভাল মানুষে রুপান্তরিত করুন। বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে তবে মানুষের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এর একটাই কারণ ক্ষমতার অপব্যবহার। পরিশেষে সরকারের কাছে আবেদন জানাবো আর কোন আবরার ফাহাদ কে যেন এমন নির্মমভাবে জীবন দিতে না হয়। ছাত্রলীগকে শামলান। শোভন-রাব্বানীরা চলে গেলেও তাদের ধুসররা এখনো ছাত্রলীগে রয়ে গেছে। এদেরকে চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি ধার করুন।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীর অভয়ারন্যে পরিনত না করে মানুষ গড়ার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলুন। বুয়েট থেকে বের হওয়া ছেলেটি যে দলের হোক না কেন সে তার কাজের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে দেশ ভাবমূর্তি উজ্জল করবে।

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক আওয়াজ বিডি


শাহ আহমদ সাজ
শাহ আহমদ সাজ
https://www.awaazbd.net/author/awaaz-usa

শাহ আহমদ সাজ ১৯৮৭ সালে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় জন্মগ্রহন করেন। শিক্ষা জীবনের শুরু ঢাকার সানরাইজ প্রি ক্যাডেট এন্ড কলেজে। তারপর ২০০৪ সালে কুলাউড়ার জালালাবাদ হাইস্কুল থেকে এসএসসি, ২০০৬ সালে মদন মোহন কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। ২০০৭ সালে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি অনার্সে ভর্তি হন।এরপর ইনফরমেশন টেকনোলজিতে পড়ালেখার জন্য লন্ডনে পাড়ি জমান এবং ক্রাউন ইন্টারন্যাশনাল কলেজে ব্যাচেলর শেষ করেন। বর্তমানে সপরিবারের যুক্তরাস্ট্রে বসবাসরত শাহ আহমদ, ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য ও সৃজনশীল সবধরনের কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। ২০১৬ সাল থেকে আওয়াজবিডি ও সাপ্তাহিক আওয়াজবিডির প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশের দায়িত্ব পালন করছেন।শাহ আহমদ বাংলাদেশ ডন-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।

mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ