"চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়"

সাইফুর রাহমান

সদা হাস্যজ্জ্বোল, সরল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন এম সাইফুর রহমান। একজন সাইফুর তাঁর কর্মজীবন দিয়ে সারা বিশ্বে পরিচিত একখণ্ড বাংলাদেশ হিসেবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ১২বার বাজেট পেশ করেছেন বর্ষীয়ান এ নেতা। তার মন্ত্রিত্বের সময়কালে বাংলাদেশের অর্থনীতি ‘ইমারজিং টাইগার’ হিসেবে আত্নপ্রকাশ করে। শহীদ প্রেসিডেন্ট ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ট সিলেটের সন্তান প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলেই ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

আজ ৫ই সেপ্টেম্বর এই ক্ষনজন্মা ব্যাক্তির ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী। আজকের এই দিনে সিলেটের উন্নয়নের রুপকার কালজয়ী জননেতা এম সাইফুর রহমানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরন করছি এবং ত‍াঁর বিদেহী আত্মার রুহের মাগফেরাত কামনা করছি। আল্লাহ যেন সিলেটবাসীর প্রিয় অভিভাবককে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করেন। আমীন।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পরে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত তিনবারের বিএনপি সরকারের ছিলেন নির্ভরযোগ্য অর্থমন্ত্রী। অথচ ছাত্রজীবনে তিনি কোন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন চার্টার্ড একাউটেনটেন্ড।

তাঁকে সর্বপ্রথম রাজনীতিতে আনেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ’৭৫-এর বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চারনেতা হত্যার পর রাজনীতির এক অস্থির সময়ে সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশের হাল ধরেন জিয়াউর রহমান। তখন সাইফুর রহমান জিয়ার বাণিজ্য বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তাকে বাণিজ্যমন্ত্রী করেন বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান।

জাতীয় গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন সাইফুর রহমান। ১৯৭৮ সালের জুন মাসে জিয়াউর রহমান যে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের ব্যানারে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেছিলেন, সেই ফ্রন্টেরও সদস্য ছিলেন তিনি। জাগদল বিলুপ্ত করে ১৯৭৮ সালে ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি’র জন্ম। সে দলেরও প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সিলেটের কৃতি সন্তান সাইফুর।

কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য করা হয় তাকে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়ার মৃত্যুর পর এইচএম এরশাদ সামরিক শাসন জারি করে অনেক রাজনীতিকের সঙ্গে সাইফুরকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ ও হুমকি দেয়া হয়। কিন্তু জাতীয়তাবাদীর আদর্শেই অবিচল থাকেন সাবেক এ অর্থমন্ত্রী। তারই প্রতিদান হিসেবে খালেদা জিয়া যতবার ক্ষমতায় গেছেন ততবার তাঁকেই দায়িত্ব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রীর।

প্রবীণ এ রাজনীতিবিদ সিলেটের মৌলভীবাজার জেলায় ১৯৩২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আব্দুল বাছিত।

১৯৪৯ সালে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে লেটার মার্ক পেয়ে মেট্টিক, ১৯৫১ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময়ে তিনি ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন সাইফুর রহমান এবং কারাবরণ করেন।
তিনি ১৯৫৩ সালের উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য লন্ডনে যান এবং ১৯৫৮ সালে চাটার্ড একাউটেন্সি ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় বেতন কমিশনে প্রাইভেট সেক্টর হতে একমাত্র সদস্য মনোনীত হন।

১৯৭৩ ও ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ জাতীয় বেতন কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করেন।
১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য ও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯১-৯৬ মেয়াদে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সময় তিনি দেশে মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) চালু করেন।

১৯৭৯ সালে তিনি মৌলভীবাজার সদর আসন থেকে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ সদস্য মনোনীত হন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে সিলেট-৪ (জৈন্তা-গোয়াইনঘাট) ও মৌলভীবাজার-৩ আসন থেকে, ২০০১ সালে সিলেট-১ ও মৌলভীবাজার-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একই সময় তিনি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘদিন থেকে তিনি প্রোস্টেট ক্যান্সারে ভুগছিলেন।
সাইফুর রহমান ১৯৯৪-৯৫ সালে এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের ভাইস-চেয়ারম্যান, ১৯৮০-৮২ ও ১৯৯১-৯৫ সময়কালে তিনি বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামী উন্নয়ন ও ইফাড এর বাংলাদেশ গর্ভনরের দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি অর্থনৈতিক কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটি একনেকের চেয়ারম্যান ছিলেন।

সাইফুর রহমান ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতির বিশেষ দূত হিসেবে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান সফর করেন। ১৯৯৫ সালে কলম্বিয়ায় অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে এবং একই বছর বসনিয়ায় অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন সাইফুর রহমান।

পেশাগত জীবনে তিনি কেমিক্যাল, তেল-গ্যাস উত্তোলন, ট্রানপোর্ট, ব্যাংকিং, ইন্সুরেন্স ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে সাইফুর রহমান তিন ছেলে ও এক মেয়ের জনক। বড় ছেলে এম নাসের রহমান মৌলভীবাজার জেলা বিএনপি’র আহবায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য।

এম সাইফুর রহমান ৫ সেপ্টেম্বর ২০০৯ তারিখে সিলেট থেকে ঢাকা আসার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাছে এক মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় তৎক্ষণাৎ মারা যান। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির যে অপূরণীয় ক্ষতি হয় তার আর কোনদিন পূরণ করা সম্ভব হয়ে উঠেনি।

তার মৃত্যুর পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি তার স্মরণে বিভিন্ন গুণীজনদের সাক্ষর সহকারে একটি বই প্রকাশ করে যেখানে নোবেল বিজয়ী বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ ইউনুস সহ বাংলাদেশ অবস্থিত সকল দূতাবাসের রাস্ট্রদূতগন স্বাক্ষর করেন এবং তাদের বেদনাসিক্ত মনোভাব ব্যাক্ত করেন। আমরা মহান এ মানুষটির বিদেহী আত্নার মাগফেরাত কামনা করি।

লেখক: সাংবাদিক, সমাজকর্মী ও সংগঠক


এমজেএইচ জামিল
এমজেএইচ জামিল
https://www.awaazbd.net/author/sylhet_awaaz
mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ