তসলিমার ক্রন্দন

ভারতের নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন- রেদওয়ানুল

আলোচিত ও সমালোচিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ভাঙার ও নারীর সমঅধিকারের লেখার সঙ্গে আমি একমত থাকলেও তার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা লেখার সাথে আমি একমত না। আমি নিজেও বিভিন্ন সময় বহুল আলোচিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের লেখার সমালোচনাও করেছি।

পারিবারিকভাবে জম্মের পর থেকে মা-বাবা ও বড় ভাই-বোনদের কোরআন তিলাওয়াতে আমাদের ঘুম ভেঙেছে। মাগরিবের নামাজ পড়ে পড়তে বসা সেই ছেলেবেলার অভ্যাস ছিল আমাদের। মহান আল্লাহর প্রতি গভীর বিশ্বাস ও আনুগত্যে কখনো আমার মনে দ্বিধা আসেনি। জম্মসূত্রেই নয়, বিশ্বাসেও আমি একজন মুসলমান। কিন্তু শৈশব থেকে পরিবার, সমাজ আমাকে সব ধর্মের বন্ধু-বান্ধব প্রিয়জনদের সাথে আত্মিক বন্ধনে বেড়ে উঠতে শিখিয়েছে। ধর্মের নামে, বর্ণের নামে জাতপাতের নামে মানুষকে শোষণ-নিপীড়ন বা হত্যার আমি বিরোধী।

এই ছোট্ট জীবনে কখনো কার সাথে ধর্মীয় কারণে ঝগড়া-বিবাদ, মনোমালিন্য বা বিরোধ যেমন হয়নি তেমনি আর হবেও না। বরং আত্মীয়স্বজন থেকে নিজ ধর্মের অনেকের সাথে আমার বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন সময়ে বিরোধ হয়েছে। মনোমালিন্য হয়েছে। আমি ধর্মে বিশ্বাসী মুসলমান হলেও কোনো দিন কোনো ধর্মের প্রতি কটাক্ষ যেমন করিনি, তেমনি কোনো ধর্মের প্রতি অসম্মানও করিনি। কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার হীনমন্যতায় কখনো আমি ভুগিনি। বরং ধর্মান্ধ অনেক আত্মীয়স্বজনের সাথে বিভিন্ন  কারণে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

একটি গণতান্ত্রিক উদার রাষ্ট্র হিসেবে ব্যাক্তিগত ভাবে আমার ২ টি দেশ খুবই পছন্দের ১, ব্রিটেন ২, আমেরিকা। সেখানে বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসীর পাশাপাশি বিভিন্ন মত-পথের মানুষ নিরাপদে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পারে। তেমনি ধর্মের প্রতি যাদের বিশ্বাস নেই তারাও শান্তিতে বসবাস করে। একটি সমাজে ধর্মে বিশ্বাসী অবিশ্বাসী নানা মত-পথের মানুষ বসবাস করবে এটা স্বাভাবিক।

মানুষ মানুষের কাছে মানুষ হিসেবেই মূল্যায়িত হবে, সম্পর্ক হবে মানুষে মানুষে চিন্তা ও মনের মিলে। কেউ কারও বিশ্বাস নিয়ে কটাক্ষ করলে, কারও মনে আঘাত দিলে সেখানে সম্পর্কে ফাটল ধরে। দূরত্ব বাড়ে। সমাজে সব মত-পথের মানুষ ধর্মবিশ্বাসী থেকে ধর্মে অবিশ্বাসীরাও বসবাস করবে, এটা তার নাগরিক অধিকার।

বেশ কয়েকদিন আগে ভারতে নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের একটি সাক্ষাৎকার দেখছিলাম ৭১ টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারটিতে প্রতিটি শব্দে শব্দে আবেগ জড়িয়ে আছে, ৭১ টেলিভিশনের সেই দিনকার সাক্ষাৎকারটির এখনো আমাকে হদয়ে নাড়া দেয়। তিনি গত মাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি লিখেন বাংলাদেশ প্রতিদিনে তার এই লেখাটি আমাকে ভালো লেগেছে।

তিনি বিভিন্ন সময় লিখেন এবং তার ফেসবুকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্ট্যাটাস দেন। তার লেখা নিয়মিত পড়লেও ফেসবুক স্ট্যাটাস মাঝেমধ্যে দেখা হয়। রাজনীতি, সমাজ ও নারীর অধিকার নিয়ে লেখাগুলো আমাদের আকর্ষণ করে। কিন্তু ধর্মীয় সমালোচনামূলক লেখা থেকে আমি নিজেকে সবসময় দূরে রাখি। তবে তসলিমা নাসরিনের যে গভীর বেদনাবোধ আমাকে তাড়িত করে, আমাকে আবেগাপ্লুত করে এবং আমার বিবেককে নাড়া দেয় সেটি হচ্ছে তার জন্মভুমিতে ফিরে আসতে না পারা।

আমরা দেশের বাইরে সাত দিনের জন্য গেলে অস্থির হয়ে উঠি দেশে ফেরার জন্য। সেখানে একজন স্বাধীনচেতা মানুষ অন্য দেশে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন, এটা যে কত কষ্টের তা বলা যাবে না। একটি মানুষ কারাগারে থাকলে সে দেশের মাটির স্পর্শ পায়। দেশের আকাশ দেখা যায়। দেশের স্বজনকে কাছে পাওয়া যায়। জেল গেটে প্রিয়জনরা দেখা করতে পারেন। কিন্তু নির্বাসিত জীবন দুঃসহ যন্ত্রণার।

তসলিমা নাসরিন লেখালেখির জন্য আলেম-ওলামাদের আক্রোশের শিকার হয়েছিলেন। ধর্মীয় নেতারা তার মাথার দাম ঘোষণা করেছিলেন। বিএনপির সেই শাসনামলে আদালত থেকে জামিন নিয়ে তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। (সূত্র জাতীয় দৈনিক পত্রিকা) তারপর তার মা-বাবাসহ অনেকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি তাদের পাশে থাকতে পারেননি। নির্বাসিত লেখিকা তসলিমাকে দেশছাড়া করে তাকে খ্যাতির চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে দিয়ে দুনিয়াব্যাপী পরিচিতি এনে দিলেও তার বুকের ভিতরে অন্তহীন বেদনা রয়েছে দেশের জন্য।

তার লেখা বিতর্কিত হলেও তার দেশপ্রেম প্রশ্নের ঊর্ধ্বে ছিল। সংবিধান নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে লেখার স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা কতটা দিয়েছে আমি সেই আলোচনায় যাচ্ছি না।

আমি মানবিক জায়গা থেকে ২টি  প্রশ্ন রাখছি- ১। ৭১-এর যুদ্ধাপরাধীরা যদি এ দেশে নাগরিকত্ব নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারেন। ২।   স্বাধীনতাবিরোধীরা যদি এ দেশে সুখের জীবন কাটিয়ে মরতে পারেন তাহলে একজন লেখিকা তসলিমা নাসরিন কেন আমৃত্যু নির্বাসিত জীবন কাটাবেন?

তার সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি। আমি তাকে চিনিনা, জানিনা। কিন্তু যার পূর্বপুরুষের ভিটামাটি বাংলায়, যার জম্ম ও বেড়ে ওঠা এ বাংলায়, যার সংগ্রাম মানুষের অধিকারের জন্য তিনি কেন প্রায় ২৫ বছর নির্বাসিত জীবন কাটানোর পরও স্বদেশে ফিরে আসতে পারবেন না? একজন খুনিও এত দিনে জেল খেটে মুক্ত বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নেন। সেখানে তসলিমা নাসরিনের অপরাধের সাজা কবে শেষ হবে?

এরও তো একটা সীমা থাকা উচিত। স্বয়ং মহান আল্লাহ যেখানে অসীম দয়াময় ও ক্ষমাশীল সেখানে আমরা দেশের মানুষ কেন এত হৃদয়হীন?

তসলিমা নাসরিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে যে খোলা চিঠি লিখেছেন তার শব্দে শব্দে আবেগ, যুক্তি ও বেদনার অশ্রু জড়িয়ে আছে। আমি বুঝতে পারি না তসলিমা নাসরিন যাদের অগ্রজ মনে করে সম্মান করে স্নেহ-সান্নিধ্যে থাকতেন, যাদের বন্ধু মনে করে কত সময় কাটিয়েছেন তাদের অনেককে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে বিভিন্ন মন্ত্রীর সামনে নানা সময় বসে থাকতে দেখি। কিন্তু অবাক হই বিবেকের দায় থেকে তারা কেউ তসলিমার জন্য একটি বার কিছু বলেন না। কেন বলেন না? আমি উত্তর খুঁজে পাই না।

সরকারসহ সবার প্রতি মানবিক অনুরোধ  পরিবারের অনেক স্বজনকে নির্বাসনে থেকে হারানোর বেদনা সয়ে তসলিমা নাসরিন অনেক শাস্তি পেয়েছেন। শোনা যায়, শরীরে এখন তার রোগশোকও বাসা বেঁধেছে। আল্লাহর ওয়াস্তে সবাই তাকে তার মাতৃভূমিতে ফিরে আসাসহ তার সব নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দিন।

লেখকঃ মোঃ রেদওয়ানুল হক মিলন

email: redoanulhaquemilon@gmail.com


অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
https://www.awaazbd.net/author/oeazq8
mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ