আমার মায়ের আত্মত্যাগ

৫৪১
আমার মায়ের আত্মত্যাগ

দীর্ঘদিন মায়ের জন্য সন্তানের আত্মত্যাগ করা এক মানবীকে নিয়ে লিখবো লিখবো করে লেখা হয়ে উঠেনি। আজ কেনো যেনো মনে হলো খুব বেশি দেরি হয়ে যাচ্ছে হয়তো। তাই বিদেশের মাটিতে বসে নিজের সন্তানকে অন্যের কাছে আহুতি দিয়ে মায়ের জন্য এক চিলতে ঋন পরিশোধ করা ফাতেমা বেগমকে নিয়ে লিখতে বসলাম।

হয়তো অবাক হচ্ছেন- কে এই ফাতেমা বেগম? হুম বলছি, ফাতেমা হলো ৮ বছর আগে ৩ বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গৃহকর্মী। যিনি শেষ পর্যন্ত গৃহকর্মীতে সীমাবদ্ধ না থেকে সন্তানের জায়গা দখল করে নিয়েছেন।

প্রথমেই বলি ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বরের কথা, সেদিন ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসির’ ডাক দেন খালেদা জিয়া। ওই দিন বাসা থেকে বের হওয়ার সময় পুলিশ তাঁকে বাধা দেয়। যখন গুলশানের কার্যালয়ে থেকে খালেদা জিয়াকে বের হতে দেওয়া হচ্ছিল না ওই সময় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পেছনে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মীরা ছাড়াও পতাকা হাতে দাঁড়ানো ছিলেন ফাতেমা।

একইসঙ্গে ২০১৫ সালে জানুয়ারি থেকে ৯২ দিন গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে অবস্থানের সময় খালেদা জিয়ার সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন ফাতেমা। দেশের ভেতর তো বটেই, দেশের বাইরে গেলেও খালেদা জিয়ার সঙ্গে থাকেন তিনি। এছাড়াও, খালেদা জিয়ার প্রতি ফাতেমার মমত্ববোধ প্রবল। সব সময় পাশে থাকা, চেয়ারপারসনকে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো মনে করিয়ে দেওয়াসহ সব কাজই ফাতেমা করে থাকেন।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারবন্দি হওয়ার পর এ পর্যন্ত দুটি রোজার এবং একটি কোরবানির ঈদ কারা হেফাজতে কাটিয়েছেন তিনি। এর আগে এক-এগারোর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুই ঈদে কারাগারে ছিলেন বিএনপি প্রধান। এ নিয়ে ষষ্ঠবারের মতো কারা হেফাজতে ঈদ করছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।

তিনি একমাত্র সাবেক কোনো নারী প্রধানমন্ত্রী যিনি ৭৪ বছর বয়সেও কোনো চাপ বা লোভের কাছে মাথা নত না করে এক অজানা পথ ধরে সামনে চলেছেন। ডায়াবেটিকস, আর্থারাইটিস ছাড়াও দাঁত ও চোখের সমস্যায় ভুগছেন তিনি। তাকে চলাচল করতে হয় হুইল চেয়ারে করে। ডায়াবেটিসের কারণে প্রতিদিন ইনসুলিন নিতে হয়।

এ মহামানবী জানতেন কারাবন্দি করলে তার সাথে কি কি ঘটনার সম্মুখীন হতে হবে তবুও তিনি পিঁছু হটেননি।

* তিনি জানতেন দেশে ফিরে এলে কারাবরণ করতে হবে, তবুও দেশে ছুঁটে এসেছেন।

* তিনি জানেন হয়তো জোর পূর্বক ফাঁসিও দিতে পারে, তবুও মাথা নত করেননি।

* তিনি জানেন একটু নত হলেই তাঁর মুক্তি সহজ, তবুও দয়া চাননি।

* তিনি তাঁর সন্তানকে হারিয়েছেন, তবুও দেশ ছেড়ে যাননি।

* তাঁর ২ সন্তানের ফুটফুটে কয়েকটি বাচ্চা রয়েছে, তাঁদের কাছেও চলে যাননি।

* তিনি জানেন আর কখনোই হয়তো প্রধানমন্ত্রী হবার সুযোগ পাবেন না, তবুও আপোষ করেননি।

তিনি জানেন পেরোলে মুক্তি দিতে চাওয়া মানে তিনি একেবারেই মুক্ত হয়ে দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারবে, তিনি দেশ ছাড়তে পারবেন না বলে পেরোলেও মুক্তি নেননি।
* একমাত্র নারী যিনি স্বামীর সহযোগিতা বিহীন একজন গৃহিনী থেকে ৩ বার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।

কারাগারে মা খালেদার ঈদ

ঈদের দিন সকালে খালেদা জিয়ার বিএসএমএমইউর ৬২১ নম্বর কেবিনে যায় পায়েস, সেমাই আর মুড়ি। এসব তৈরি করেন কেন্দ্রীয় কারাগারের কারারক্ষীরা। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কম চিনি দিয়ে তৈরি করা হয় এ খাবার। মানা হয় তার ডায়েট চার্ট।

দুপুরে খাবারের জন্য ভাত অথবা পোলাওয়ের যেকোনো একটির সঙ্গে (ইচ্ছের ওপর নির্ভর করে) পাবেন ডিম, রুই মাছ, মাংস আর আলুর দম। খালেদা জিয়ার দাঁতে সমস্যা থাকায় তার মাংস অপেক্ষাকৃত নরম হবে।

সন্ধ্যার পরপর খালেদার জন্য থাকছে পোলাও (নরম)। সঙ্গে পরিমাণ মতো কোরবানির গরু অথবা খাসির মাংস, একটি ডিম, ডায়াবেটিক মিষ্টি, পান-সুপারি এবং কোমল পানীয়।
তবে ঈদের দিন তার পরিবারের সদস্যরা তার জন্য খাবার আনলে, তিনি চাইলে সে খাবার খেতে পারবেন। তবে খাবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাকে খেতে দেওয়া হবে।

এবারের ঈদে কারা কর্তৃপক্ষ পরিবারের ৬ সদস্যকে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেয়। দুপুরের দিকে খালেদা জিয়ার প্রয়াত ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি, কোকোর দুই কন্যা জাহিয়া রহমান ও জাফিয়া রহমান ছাড়াও বেগম জিয়ার ভাই শামীম ইস্কান্দার, স্ত্রী কানিজ ফাতেমা ও তাদের ছেলে অভিক ইস্কান্দার বিএসএমএমইউ’তে ৬২১ নম্বর কেবিনে প্রবেশ করেন। হাসপাতালে গিয়ে শুরুতেই কোকোর দুই মেয়ে দাদির পা ছুঁয়ে সালাম করেন। এসময় বেগম জিয়াও তাদের বুকে জড়িয়ে আদর করেন।

ঈদ উপলক্ষে কোকোর স্ত্রী সিঁথি বাসা থেকে শাশুড়ির জন্য পোলাও, মাংসের রেজালা, আলুর চপ, সবজি, জর্দা, দুধ-সেমাই ও মিষ্টি প্রস্তুত করে নিয়ে যান। হাসপাতালে খালেদা জিয়া তাঁর দুই নাতনিকে পাশে বসিয়ে বাসা থেকে আনা খাবার খান। এসময় গৃহকর্মী ফাতেমা বেগমও ঈদের বেগম জিয়ার সঙ্গে ঈদের খাবার খান।

এই সেই ফাতেমা যিনি তার মায়ের জন্য এই দেড় বছর সকল ঈদ আনন্দ তার নাড়ীছেড়া সন্তানদের থেকে বিসর্জন দিয়েছেন। মাকে সেবা করার প্রয়াসে বিনা অপরাধে নিজেকে বন্দী কারাবাসে জীবন উৎসর্গ করে দিচ্ছেন। তার অবুঝ বাচ্চাটাও তার মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ যেনো এক আত্মার সাথে আত্মার টান। সবকিছু উৎসর্গ করে হলেও দেশমাতা খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ফাতেমার সন্তানটাও আজ নিজেকে শক্ত করেছে। সে মুক্তিযুদ্ধ কি-তা দেখেনি, তবে তার মায়ের দেশপ্রেম এবং মাতৃত্বের প্রতি তার মায়ের অগাধ ভালোবাসা দেখেছে।

লেখক: লন্ডন প্রবাসী।


mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ