আমাদের স্বজন হারানোর বেদনা

অনলাইন ডেস্ক
মোঃ রেদওয়ানুল হক মিলন
২৬ জুলাই ২০১৯, ১১:২৮ অপরাহ্ণ
১৭৩৬
রেদওয়ানুল হক মিলন

মন আজ ভারাকান্ত। ১৯ মে এইচএসসি পরীক্ষার আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। সে ১৯শে মে থেকে বন্ধুবান্ধবদের সাথে তেমন যোগাযোগ নেই। অনেকেই এখন ব্যস্ত সময় পার করছে। কেউ ভার্সিটি কোচিং করতে বড় বড় শহরে গিয়েছে। কেউ আবার বিয়ের পিরিতে বসে শ্বশুরালয়ে পাড়ি জমিয়েছে। সেদিন এইচএসসি ফলাফল ঘোষণা হয়েছে। বন্ধুদের মধ্যে তেমন কেউ ভালো ফলাফল করতে পারেনি যদি ও কলেজ তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু আশা করেছিল। আমার কথা বাদেই দিলাম আমার মতো ছাত্র বেঁচে থাকার চেয়ে না থাকায় উত্তম। কেননা আমাকে নিয়ে কোন কাজ হবে না।

থাকুক সে কথা বলছিলাম ভারাকান্ত মন নিয়ে।

আমি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কথা বলি ও লেখি অনেক বিষয়ে লেখেছি কিন্তু নিজের ভিতরের ছাইচাপা আগুন ভুলে যায় অতীতকে মনে করে। মানুষের এক জীবনে অনেক কাহিনী বেরিয়ে আসে। স্বপ্নচারী মানুষ ও বুকভরা কষ্ট নিয়ে বসবাস করে। তবে হৃদয়ে অতলে লুকিয়ে থাকা সেই কষ্ট সহজে কাউকে জানান দিতে কারও ভালো লাগে না বলে আমিও আমার ভিতরের চাইচাপা কষ্ট গুলো কাউকে বলি না। আমরা সব সময় আনন্দের ঢেউয়ে ভেসে বেড়াতে পছন্দ করি। কিন্তু সেই আনন্দকে সুখ হিসেবে ধরে নিয়ে আবার আপ্লুত হই। তবে একটা জিনিস মনে রাখা ভালো সব সৃষ্টির আড়ালে বেদনা লুকিয়ে থাকে।

এই ছোট্ট জীবনে বড় বড় সময় গুলোতে আমাকে থাকতে হয়েছে কষ্টের দহনে। নিজের মা-বাবাকে হারানোর কষ্ট গুলো আমায় বিদ্ধ করে রাখত সব সময়। সেই ছোট্ট বেলা থেকেই কষ্টেত সমুদ্রে সাতার কেটে আমার বেড়ে ওঠা। এই ছোট্ট বয়সে মা-বাবাকে হারিয়ে আমি আজ দিশেহারা। আমার জীবনে প্রথম মৃত্যুর খবর আমার মা কিন্তু মৃত্যুর কষ্ট অনুভবের বয়স তখন আমার হয়নি। তখন আমি মৃত্যু কথাটির অর্থ জানতাম না বা বুঝতাম না। শুধু দেখতাম একটি নিথর দেহে সাদা কাপড় মোড়ানো অবস্থায় বারান্দায় শুয়ে রয়েছে। কিন্তু মৃত্যু যে কত ভয়ঙ্কর দেহে তার কোন প্রমাণ ছিল না।

এরপর হারালাম বাবাকে। সেদিন শোকের নিবিড় অন্ধকার রুপ দেখতে পাই বাবার মৃত্যুতে। আমার বাবা দীর্ঘ দিন অসুস্থ ছিলেন বাবার মৃত্যুতে আমরা ভাই-বোনরা ছিন্ন-বিছিন্ন হয়ে গেলাম আমরা আর এক সাথে নেই। এক সাথে বসে ২ মিনিট কথা হয়না। মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয় তাও আবার ২/৩ মিনিট।

আমি জীবনে প্রথম উপলব্ধি করি মৃত্যু শোকের তীব্র যন্ত্রণা। আমার বয়স তখন ৮/ ৯ বছর বাবার সাথে আমার ছিল গভীর বন্ধুত্ব ছোট্ট বেলায় মাকে হারিয়ে বাবাকেই মা ভাবতাম তিনিই আমার খেলার সাথী অনেক কিছু। এই মৃত্যুর কষ্ট সামলাতে আমাকে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। কিন্তু আমি তখনো জানতাম না আমার জন্য আর ও অনেক মৃত্যু অপেক্ষা করছে। নিয়তির নিষ্ঠুরতা বলে কথা। আমরা সবাই নানা সুখে-দুঃখে জীবন অতিবাহিত করি। নিজের ভিতরের সব কষ্টগুলোকে আড়াল করে রাখি।

গতকাল এক স্যারে সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম ৩ ঘন্টা সংলাপ শেষে আমাকে বলেন মিলন নিজেকে আর নিজের আদর্শকে কখনো বিক্রি করিও না, জবাবে বললাম স্যার দু'আ করিয়েন। চার দিকের এই নিষ্ঠুর আচরণ মানিয়ে নিয়ে তবুও আদর্শকে ধরে রাখার চেষ্টা করি।

যাদেরকে খুব কাছের মানুষ মনে করতাম সেই মানুষ গুলোকে ছেড়ে প্রায় দীর্ঘ দিন বাইরে অবস্থান করছি। তাদের সাথে দেখা হয়, কিন্তু কথা হয় না। তখন বুকটা ফেটে যায়। একটি বার কথা বলার জন্য তারা কেমন আছেন, কি করছেন তা জানার জন্য। সেই দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক যে নিমিষেই শেষ হয়ে যাবে তা কখনো ভাবিনি। তবুও প্রিয় মানুষদের জন্য সৃষ্টিকর্তার দরবারে প্রার্থনা করি। তারা যেন সব সময় ভালো থাকে সুস্থ থাকে, নিরাপদে থাকে। এই কামনাই করি সব সময় প্রিয় মানুষদের জন্য।

শুধু কি আমার মন ভারাকান্ত তা নই। আজ দেশের প্রতিটি মানুষের মন ভারাকান্ত একদিকে বন্যা কবলিত হাজার হাজার মানুষের দুর্ভোগ। আরেক দিকে ঢাকাতে ডেঙ্গু মশার উৎপাত, ডেঙ্গু মশার মিছিলে ২৬ জনের মৃত্যুর নাম এসেছে। আমাদের দুই নগরপিতা মশা মারতে ব্যর্থ হয়েছে। আবার তারাই গণমাধ্যমে বড় বড় কথা বলেন। আসলে মানুষের স্বজন হারানোর বেদনা নগরপিতাদের স্পর্শ করে না বলেই তারা দাম্ভিকভাবে বলেন আমাদের করার কিছুই নাই। করার থাকবেই বা কি কিরে নিজেরদের কেউ ডেঙ্গুজ্বরে মারা যেত, তাহলে বুঝতেন স্বজন হারানোর বেদনা কি। তাহরে আর এভাবে কথা বলতেন না। তবু ও নগরপিতাদের জন্য শুভ কমনা রইলো আগামীর জন্য।

লিখতে বসলে ভাঙ্গা হৃদয়ে বেদনাবিধুর চিত্রে বিষাদগ্রস্ত হয়ে বার বার একটি কথা ভাবি বা লিখি কি অসভ্য সমাজে আমরা বসবাস করি। আমাদের বিবেক পর্যন্ত নেই। নুন্যতম চিন্তা শক্তি করার ক্ষমতাও নেই আমাদের। ধর্ষণের সিরিজ গোটা দেশবাসীকে অশান্ত, অস্থির ও আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে। এটা শেষ হতেই না হতেই আরেকটি ঘটনার রুপ নিয়েছে। পদ্মা সেতুতে মানুষের জবাই করা মাথা প্রয়োজন বলে একদল মানসিক বিকারগ্রস্ত জানোয়ার সমগ্র দেশ গুজব ছড়িয়েছি। সামাজিক অপরাধের সব সীমা ছড়িয়ে গেছে।

গত কয়েকদিন আগে ঢাকা বাড্ডায় সাড়ে তিন বছরের কন্যাসন্তান তুবাকে স্কুলে ভর্তি করাতে খবর নিতে গিয়েছিলেন মা তসলিমা বেগম রেনু। ২০১৬ সাল থেকে রেনু স্বামীর সাথে থাকেন না। শ্বশুরালয়ে ও সে যান না। একাই দু-সন্তান নিয়ে জীবন নির্বাহ করতেন বাড্ডায়। কেউ তাকে জীবন লড়ায়ে থামিয়ে দিতে পারেননি। কিন্তু সেদিন একদল সন্তানতুল্য কিশোর অসভ্য জানোয়ার সংঘবদ্ধভাবে স্কুল থেকে রেনুকে টেনে হিঁচড়ে বের করে গণপিটুনি দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। ঠান্ডা মাথার খুনিরা মানুষ হত্যা করে। আর মানুষরূপী কিছু জানোয়ার তা ভিডিও ভাইরাল করে লাইক কমেন্টের প্রতিযোগিতায় নামে। মানুষের কলজে ছিঁড়ে কান্না এসেছে। জানুয়ারিতেই রেনু সন্তানদের নিয়ে আমেরিকা চলে যাওয়ার কথা ছিল।

ছেলেধরার গুজবে সারা দেশে আরও হত্যা ও পিটিয়ে আহত করার ঘটনা ঘটেছে। রাষ্ট্র মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। সমাজ এখন আর আগের মতো মানবিক মূল্যবোধ ও মায়া-মমতা লালন করে না। নষ্ট সমাজ নষ্ট হতে হতে এমন জায়গায় থেমেছে যেখানে সংঘবদ্ধভাবে মানুষ হত্যার বিকৃত উৎসবে মহাবীরের মতো যোগ দিতে পারে। কিন্তু চোখের সামনে সংঘটিত কোনো অপরাধ বা হত্যার- প্রতিরোধে এগিয়ে যেতে পারে না। গোটা সমাজ আজ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। মানুষ এখন শান্তিতে জীবনযাপন করতে পারে না খোলা মাঠে বসে মুক্ত বাতাসের শ্বাস নিতে ভয় পায় কি জানি কখন কি হয়। শুধু প্রশাসন নয়, মানুষেরও সামাজিক নাগরিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। কেউ গুজব ছড়ালে তার সম্পর্কে পাশের থানায় পুলিশের কাছে খবর দেওয়া যায়। কেউ চোখের সামনে অপরাধ করলে পুলিশকে খবর দেওয়া দায়িত্ব। এমনকি কাউকে ছেলেধরা সন্দেহ হলে আইন হাতে তুলে না নিয়ে পুলিশকে জানানো প্রয়োজন। সভ্য সমাজের এটাই রীতি। আইন হাতে তুলে নিয়ে মানুষ হত্যা জঘন্য অপরাধ। যারা হত্যাকান্ড- ঘটাচ্ছে তারা খুনি। সংঘবদ্ধ খুনিদের সন্ধান এখন পুলিশের কাছে দেওয়া জরুরি।

বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যার ভিডিও চিত্র দেখে হৃদয় কাপেনি এমন কোন ব্যাক্তি নেই। গত ২৬ জুন সকাল ১০ টার দিকে প্রকাশ্যে দিবালোকে কলেজের সামনে ব্যস্ত সড়কে এই নির্মম ও রোমহষক ঘটনা ঘটেছে। বন্দুকযুদ্ধে নিহত নয়ন বন্ডের নেতৃত্বে যে সন্ত্রাসী ও মাদকবাহিনী গড়ে উঠেছিল তার সঙ্গে যে স্থানীয় এমপিপুত্রের গভীর সম্পর্ক ছিল তা এখন সবার জানা হয়ে গেছে। মাদক নিয়ে ধরা পড়ার পরও তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রকাশ্য দিবালোকে রিফাতকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে সেই দৃশ্য গোটা দেশ দেখেছে। তার স্ত্রী মিন্নি চেষ্টা করেও স্বামীকে বাঁচাতে পারেননি। ফেনীর মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রিফার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনার পর একদল পুলিশের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। বরগুনার ঘটনাপ্রবাহকে নাটকের পর্ব বলেই মনে করছে অনেকে। কারণ, সাক্ষী মিন্নি হয়ে গেলেন আসামি! পাঁচ দিনের রিমান্ড তার আগে ১২ ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদ সব মিলিয়ে চরম মানসিক নির্যাতন। মিন্নির শ্বশুর হঠাৎ তার বিরুদ্ধে চলে গেলেন। এমপিপুত্র মিন্নি গ্রেফতারের আগের দিন মানববন্ধন করে তাকে আটক করার দাবি জানালেন। এমনকি অর্থ ও ক্ষমতার কাছে নত আইনজীবীরা মিন্নির পাশে দাঁড়ালেন না। বরগুনার ভয়াবহ হত্যাকান্ড ঘিরে দেশজুড়ে এখন ন্যায়বিচার নিয়ে রহস্য আর কৌতূহল। প্রশ্ন আর প্রশ্ন। সব মিলিয়ে দেশের মানুষ শান্তিতে নেই।

লেখকঃ মোঃ রেদওয়ানুল হক মিলন

Email: redoanulhaquemilon@gmail.com

এসএম/আওয়াজবিডি


mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ