সময়টা চলে গেছে ধর্ষকদের হাতের মুঠোয় (পর্ব-৬)

অনলাইন ডেস্ক
মোঃ রেদওয়ানুল হক মিলন
২১ জুন ২০১৯, ১২:১৮ অপরাহ্ণ
৩৬৫
ধর্ষকদের হাতের মুঠোয়

মোঃ রেদওয়ানুল হক মিলন- দেশে দিন দিন বাড়ছে ধর্ষণ নামের নির্মমতা। শুধু নারীই নয়, শিশু-কিশোরও শিকার হচ্ছে এই বর্বরতার। ধর্ষণ কিংবা গণধর্ষণই শেষ নয়, খুন করা হচ্ছে নৃশংসভাবে। গত কয়েক মাস ধরে যেন ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর খুনের উৎসব চলছে। এভাবে প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নারী ও শিশুরা। বাদ যাচ্ছে না ৩/৫ বছরের কম বয়সী কন্যা শিশুও। অভাগ করা বিষয় হচ্ছে তিন বা চার বছরের দুধের শিশুও শিকার হচ্ছে এই বিকৃত যৌনতার। এতেই থামছে না ধর্ষক।

ধর্ষণের পর ধর্ষিতাকে  আবার খুনও করা হচ্ছে। কিন্তু সমাজে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর লোকলজ্জায় এসব ঘটনার সিংহভাগই প্রকাশ করছে না অনেকেই অসম্মানের ভয়ে তা লুকিয়ে যাচ্ছে তাদের পরিবার। দীর্ঘ মেয়াদে হেনস্থার ভয়ে করছে না মামলা। বরং জানাজানি হওয়ার ভয়ে নারীর উপর এসব ঘটনায় পরিবার গুলো এমনভাবে চেপে যাচ্ছে যেন কিছুই ঘটেনি। তারপরও ছিটেফোঁটা যে ক’টি ঘটনা প্রকাশ পাচ্ছে তাতেই এখন আঁতকে উঠার মতো পরিস্থিতি। এই চিত্র যেমন রাজধানী শহর ঢাকায়, তেমনি সারা দেশের। এর মধ্যে কিছু কিছু ধর্ষণের নির্মমতা হতবাক করে দিচ্ছে সবাইকে।

৩/৫ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৬০ বছরের বৃদ্ধাও রেহাই পাচ্ছেন না ধর্ষণের হাত থেকে। নিজের জন্মদাতা পিতা, সৎ পিতা, শিক্ষক, নিকটাত্মীয় কারো হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না নারীর। কর্মক্ষেত্রে, চলন্ত বাসে, এমনকি নিজের ঘরে পর্যন্ত নেই নিরাপত্তা। এ যেন এক অন্তবিহীন ঘূর্ণিঝড়ের করাল থাবা। অতৃপ্ত যৌন আকাঙ্খা, দেয়ালে নগ্ন পোস্টার, যৌন উত্তেজক অবৈধ বইয়ের রমরমা ব্যবসা, অশ্লীল পত্রপত্রিকা, অশ্লীল ছায়াছবি প্রদর্শন, ব্লুফিল্ম, পর্নোগ্রাফি, চলচ্চিত্রে নারীকে ধর্ষণের দৃশ্যের মাধ্যমে সমাজে রাস্তাঘাটে বাস্তবে ধর্ষণ করার উৎসাহ যোগান, নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার, ইন্টারনেটে অশ্লীল সাইটগুলো উম্মুক্ত করে দেয়া, প্রেমে ব্যর্থতা, যৌন উত্তেজক মাদক ইয়াবার বহুল প্রসার ইত্যাদি কারণে দিন দিন ধর্ষণ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে একদিকে বাড়ছে ধর্ষণের মাত্রা অন্যদিকে বাড়ছে মানুষের উদ্বেগ। সবকিছুকে ছাড়িয়ে ধর্ষণ এক মহামারীতে রূপান্তরিত হয়েছে সারা দেশ জুড়ে।

নতুন নতুন পদ্ধতি, নতুন নতুন প্রক্রিয়ায় এগিয়ে চলে ধর্ষণের হার। গণধর্ষণ, পালাক্রমে ধর্ষণ, উপুর্যোপুরি ধর্ষণ, আটকে রেখে ধর্ষণের খবর বেরোচ্ছে প্রতিদিন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা কোন কিছুই যেন রোধ করতে পারছেনা ধর্ষণের মহামারী। শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক নারী পর্যন্ত বাদ যাচ্ছে না ধর্ষকদের হাত থেকে। প্রশ্ন হল বাংলাদেশে কেন এই ধর্ষণের মহামারী এবং ধর্ষণের মহোৎসব। এর কারণ হচ্ছে চলচ্চিত্রে, টেলিভিশনে এবং সংস্কৃতিতে নগ্নতার ছড়াছড়ি এমন হয়েছে যে, দেশে নারীরা যেন শুধুমাত্র যৌনতার প্রতীক। সেখানে এমন একটি সংস্কৃতি চালু হয়ে গেছে, যে নারী যত নগ্ন হতে পারবে, যে নারী যত সংস্কার বিরোধী হতে পারবে তাকে ততো বেশি মূল্যায়ন করা হবে।

এদেরকেই আবার উৎসাহিত করা হয়। আমরা জানি চলচ্চিত্রের একেকজন তারকা ক্ষমতাবান যে কোন নেতা-নেত্রীদের চেয়ে বেশি মূল্যায়িত হন। তাই একদিকে গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি দেওয়ার এই চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে। এই অবস্থা বজায় রেখে ধর্ষণ মহামারী থেকে বাংলাদেশ কিছুতেই রেহাই পেতে পারে না। আমাদের এখন ভাবা দরকার যে, এ বিচারকাজ অন্যভাবেও করা যায়। আমরা কি পুরো ব্যবস্থাটাই এমনভাবে ঢেলে সাজাতে পারি না যেখানে ধর্ষিতার প্রতি সংবেদনশীল থাকবে আদালত ও রাষ্ট্র? এর জন্য প্রথমেই এমন ব্যবস্থা করা দরকার যাতে ধর্ষককে বলা হবে সে প্রমাণ করুক যে, সে ধর্ষণ করেনি। উকিলের জেরার মুখে তার অপকীর্তি বেরিয়ে আসতে বাধ্য হবে তখন।

বর্তমান আইনের কারণে ধর্ষিতাকে উপদেশ দেওয়া হয় ধর্ষণের পর গোসল না করতে যাতে প্রমাণ মুছে না যায়। কেন একজন ধর্ষিতাকে সব সইতে হবে? চলতে পথে গায়ে এক ফোঁটা কাদা লাগলেও যতক্ষণ না তা ধুয়ে ফেলি আমরা ততক্ষণ একটা অস্বস্তি থেকে যায়। আর ধর্ষণের পর গোসল না করে কীভাবে আক্রান্ত ব্যক্তি ‘আলামত’ বহন করে যাবেন? আবার বাস্তব কারণে ঘটনার অনেক দিন পর ধর্ষিতা অভিযোগ দাখিল করতে পারেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সামাজিক সম্মানহানির ভয়ে ধর্ষিতা বা তার পরিবারের পক্ষে মামলা বা অভিযোগ করা সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষক বা তার পরিবার বা বন্ধুদের ব্ল্যাকমেইলিং বা ভয়ভীতির শিকার হয়ে ধর্ষিতার নারীর পরিবার মামলা করতে বাধ্য হন

আমরা এমন বিচার ব্যবস্থাই চাই। আমরা নারীবান্ধব আইন চাই। ধর্ষিতার প্রতি সহানুভূতিশীল সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা চাই। চাই এমন প্রশাসন যে ধর্ষিতার প্রতি চূড়ান্ত সংবেদনশীল ও অপরাধের বিষয়ে জিরো টলারেন্স দেখাবে। ধর্ষিতা কোথায় গিয়েছিলেন কেন গিয়েছিলেন কী পোশাক পরেছিলেন সেটি বিবেচ্য বিষয় হবে না। একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক যে কোনো সময় যে কোনো স্থানে যেতে পারেন।

তাকে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রর। সেখানে ব্যর্থ রাষ্ট্র ও সমাজ ধর্ষিতার দিকে আঙুল তুলতে পারে না। ধর্ষণ আসলে হত্যার চেয়েও ভয়ঙ্কর এক অপরাধ। সে অপরাধে কোনো ছাড় দেওয়া চলবে না। কারণ ছাড় দিতে দিতে আজকের বাংলাদেশ একটি ধর্ষণপ্রবণ দেশে পরিণত হয়েছে। সময়টা চলে গেছে ধর্ষকদের মুঠোয়। বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বিভাগকে সেই নষ্ট হাতের বিষয়ে হতে হবে কঠোরতম।

লেখকঃ মোঃ রেদওয়ানুল হক মিলন

redoanulhaquemilon@gmail.com


mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ