আমেরিকায় সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে বাংলাদেশি যুবকদের লেলিয়ে দিচ্ছেন কারা?

অনলাইন ডেস্ক
ইমাম কাজী কায়্যূম
১৫ জুন ২০১৯, ০৬:০৭ পূর্বাহ্ণ
৩৭৫
ইমাম কাজী কায়্যূম

১৭ই অক্টোবর ২০১২ সনে ষ্টুডেন্ট ভিসায় আমেরিকায় আসা কাজী নাফিস, ফ্যামিলি ভিসায় স্থায়ী অভিবাসী হয়ে আসা আকায়েদ উল্লাহ ১১ই ডিসেম্বর ২০১৭ সনে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে আটক হয়ে বিচারে দোষী স্বাব্যস্ত হয়ে যখন মানবেতর জীবন যাপন করছেন জেলখানায়, এরই মধ্যে কিছুদিন পর গত ৬ই জুন, ২০১৯ তাদেরই আরেক সতীর্থ ২২ বছরের বাংলাদেশি যুবক আশিকুল আলমকে নিউইয়র্কের মিনি বাংলাদেশ জ্যাকসন হাইটস থেকে এফবিআই গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তার প্লানগুলোর মধ্যে একটি প্লান এই ছিল যে, সে তার আক্রমণের সময় এনওয়াইপিডির অনেকগুলো পুলিশ অফিসারকে একই সাথে মেরে ফেলতে চেয়েছিল বলে স্বীকার করেছে।

২২ বছরের এই যুবকটির অভিযোগ এতই গুরতর ছিল যে, গত ১২ই জুন, ২০১৯ নিউইয়র্ক শহরের ব্রন্সে অনুষ্ঠিত বাপা (বাংলাদেশি-আমেরিকান পুলিশ এসোসিয়েশন) কর্তৃক আয়োজি এক টাউন হল মিটিং এ যুবকটি কর্তৃক সংগঠিত সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের নিন্দা না করে, বা যেসব গভীর পানির মাছরা ধর্মীয় শিক্ষা, সংস্কৃতি, সেবা, দাতব্য ও আমেরিকান জনপ্রতিনিধিদের স্বেচ্ছামূলক নির্বাচনী সহায়তা প্রদানের আড়ালে, তাদের অদৃশ্য ‘সন্ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে জেহাদী তৎপরতায়’ আমাদের সরল সোজা যুবক-যুবতীদের ছলে-বলে কলে-কৌশলে উৎসাহিত করে এসব অঘটন ঘটিয়ে থাকেন এবং বরাবরই এই মোড়লরা পুরো বিষয়টিকে ধূম্রজালে ফেলে রেখে ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যান, তাদেরকে খুঁজে বের করার কোন প্রোগ্রাম পুলিশ বিভাগের আছে কিনা, সে প্রশ্ন না করে যুবকটির প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন পূর্বক তাকে বের করে এনে কোন কাউন্সিল সেবা দেয়া যায় কিনা তা নিয়ে পুলিশ কমিশনার ও’নীলকে একজন একটিভষ্ট প্রশ্ন করলে, তিনি বিরক্ত হয়ে বলেন, এমনটি মোটেও সম্ভব নয়। (তাহলে তারা আরোও প্রশ্রয় পাবে। )

তিনি বলেন, নিউইয়র্ক শহরে আমরা সবাই শান্তিতে সহ অবস্থানে থাকতে চাই। কোন অবস্থাতেই কোন সন্ত্রাসকে এখানে প্রশ্রয় দেয়া যাবেনা। আমন্ত্রিত অতিথির কেউ কেউ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের গৃহ পালিত এসব ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ প্রকৃতির ভদ্রবেশী সন্ত্রাসীদের, যারা আমাদের যুবক-যুবতীদের মস্তিষ্ক ধোলাই করে এই ভয়াবহতার দিকে তাদের ঠেলে দিচ্ছেন, খুঁজে পাবার বা ধরার কোন ব্যবস্থা এনওয়াইপিডি’র আছে কিনা, সে সম্মন্ধে পুলিশ কমিশনারকে জিজ্ঞেস করার জন্য বাপার অনুষ্ঠান সণ্চালকের নিকট নাম রেজিষ্ট্রি করলেও রহস্যজনক ভাবে বাপার প্রশ্ন কন্ট্রোলকারীরা তাদেরকে সে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি করার সুযোগ দেননি।

বরং তারা তাদের পছন্দের লোকদের অনেক অপছন্দ ও হাস্যকর প্রশ্নের সুযোগ দিয়ে পরে পুলিশ কমিশনারকে বাহবা ও প্ল্যাক প্রদান করেন এবং তাঁর সাথে ফটো সেশান করে প্রোগ্রামের ইতি টানেন। উল্লেখ্য, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের অভিযোগে পর পর এই তিন যুবকের গ্রেফতার হওয়া, দোষী প্রমাণিত ও সাজা প্রাপ্তি আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের মান সম্মানকে ধূলোয় মিশিয়েছে। জঘন্য সন্ত্রাসী এই ঘটনাগুলোর পর মার্কিনীরা বাংলাদেশি ও আমাদের যুবক-যুবতীদের অন্য চোখে দেখতে শুরু করেছেন, যার বিরূপ প্রতিক্রিয়া আমেরিকায় আমাদের নতুন প্রজন্মের সামনে চলার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে বৈ কি?

কিন্তু এতে কি আমরা যারা মসজিদ-মাদরাসা, ইসলামিক ও সামাজিক সেন্টার এবং সভা-সমিতি নিয়ে ধর্মীয় ও সমাজ সেবায় লিপ্ত রয়েছি, তাদের কি কোনই দায়িত্ব নেই?

৯/১১ এর পর, বিশেষ করে ধর্মীয় সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মুসলমানদের সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে জ্যাকসন হাইটস্থ মোহাম্মদী কম্যিউনিটি সেন্টার, যার কার্য পরিধি কেবল মসজিদের চার দেয়ালের ভিতরই আবদ্ধ না রেখে এর স্বেচ্ছাসেবী অঙ্গ সংগঠন “এন্টাই-টেরোরিজম এওয়ারন্যাস ইউনিট” যার মূলমন্ত্র বা ষ্টেটমেন্ট অব মিশন “Says Something, If Sees Something” এর ভিত্তিতে অভীষ্ট এর লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে। এতে ভিনমূখী প্রবল প্রতিরোধ, সমালোচনা ও কোণঠাসার বিড়ম্বনা সত্বেও, কাজী নাফিস থেকে আকায়েদ উল্লাহ এবং তারপর আশিকুল আলম পর্যন্ত এই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসে যখন যেখানেই সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক যতসব ঘটনা ঘটেছে, কম্যিউনিটিকে সচেতন করতে সেসব বিষয়কে অকুতোভয়ে তুলে ধরেছে।

এন্টাই-টেরোরিজম এওয়্যারনেস ইউনিট কখনোও সাহসী কণ্ঠে বা কলমে পিছপা হয়নি। ATAU মনে করে যে, যুক্তরাষ্ট্রে গজে ওঠা কোন এক বিশেষ বাংলাদেশী রাজনৈতিক জংগী ধর্মীয় গোষ্ঠি, যাদের মূল আওয়াজ “ইসলামী হুকুমাত ও জিহাদ” এজেন্ডাকে ভিন নামে এদেশের বিভিন্ন সুযোগের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে তাদেরই আমেরিকান গৃহপালিতদের পরিচালনায় ছলে-বলে-কলে-কৌশলে মসজিদ, ইসলামিক সেন্টার, মাদরাসা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আয়ত্বে নিয়ে তাদের অদৃশ্য জেহাদী সবক প্রদানের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্ররোচনায় আমাদের নতুন প্রজন্মের মস্তিষ্ক ধোলাই করে চলেছেন, পরিস্থিতির শিকার হয়ে ও এর ভয়াবহতা জেনেও সৎ কর্মের নামে দুষ্কর্মের দিকে আমাদের যুবক-যুবতীরা ধাবিত হতে দ্বিধাবোধ করছেন না, তা কি আমাদের ভেবে দেখার বিষয় নয়? কাজী নাফিস ও আকায়েদ উল্লাহর ঘটনার পর তাদের পক্ষে ও তাদের মুক্তির জন্য এমনকি তাদেরকে বাঁচাতে আমরা তথাকথিত কিছু একটিভষ্টদের লবিং ও লোক দেখানো নিন্দার প্রেস কন্ফারেন্স করে পরোক্ষভাবে তাদের পক্ষেই কথা বলতে শুনেছি। তাদেরকে আমরা এও বলতে শুনেছি যে, এরা আমাদেরই সন্তান, যেমন করেই হোক, এদেরকে আমাদের বাঁচাতে হবে। এরা নাকি অসুস্থ!? মানসিক ভারসাম্যহীন।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কারা এদেরকে এমন বানালো? কেন এরা আজ মানসিক ভারসাম্যহীন হলো তারা? কাদের প্ররোচনায় এরা এমন মরিয়া হয়ে উঠলো ? ATAU মনে করে যে, এসব গভীর পানির মাছেরা, যারা তাদের মিষ্টিবডির প্রলেপিত রিমোট কর্মকান্ডের আড়ালে আমাদের সরল ও সহজ নতুন প্রজন্মদের উস্কানী দিয়ে ‘নিরব জিহাদের’ ভূমিকায় একটির পর আরেকটি সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটাচ্ছেন, তারা বরাবরই থেকে যাচ্ছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

তাই, আসুন আমরা এসব মোড়লদের ও তাদের পরিচালিত ধর্মীয় সেন্টার বা সংগঠনগুলোকে চিহ্নিত করি এবং আমাদের যুবক যুবতীদের তাদের খপ্পর থেকে রক্ষা করি। ATAU আরোও মনে করে যে, ১৪০০ শ বছরেরও বেশী আগে নবী মোহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর শ্বাশ্বত বিদায় হজ্জের ভাষণের মাধ্যমে কেয়ামত পর্যন্ত আসা মানুষের জন্য যে ইসলাম দিয়ে গেছেন, সেই ইসলামই একমাত্র শান্তির ইসলাম। পরন্তু তালিবান, আলশাবাব, বকোহারামী, আইএস ও তাদের মোড়ল মওদুদীর জামায়াতে ইসলামী’র সন্ত্রাসে ভরা ইসলাম কখনোই শান্তির ইসলাম হতে পারেনা।

এমন ইসলাম বা ইসলামী ও সামাজিক কর্মকান্ড পরোক্ষভাবে শান্তিপূর্ণ মুসলমান ও তাদের নতুন প্রজন্মকে সন্ত্রাসের দিকেই ধাবিত করে। কাজী নাফিস, আকায়েদ উল্লাহ ও আশিকুল আলম তেমনি ইসলাম অনুস্মরণের কারনেই আজ তাদের এ দশা হয়েছে বলে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সংগঠন এন্টাই-টেরোরিজম এওয়ারন্যাস ইউনিট মনে করে।

দু:খজনক হলেও সত্য যে, এতসব ঘটনার পরও উত্তর আমেরিকা প্রবাসে বাংলাদেশীদের এমন কোন সংগঠন নেই, যেখান থেকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যথাযত ভূমিকা পালন করা হচ্ছে। প্রতিটি সংগঠনই কোন না কোন ভাবে বাংলাদেশের বিতর্কিত একটি ধর্মীয় জংগী সংগঠনকে সমর্থন করে বলে মনে হয়। প্রবাসে কিংবা দেশে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদকে বন্ধ ও আমাদের নতুন প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে তাদের গতিপথকে ঝামেলা মুক্ত করতেই হবে। সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সচেতনতাকে করতে হবে আরোও বৃদ্ধি।

লেখক: পরিচালক, এন্টাই টেরোরিজম এওয়্যারনেস ইউনিট।


mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ