ধর্ষকের পক্ষে এত মানুষ, এরা কারা! পর্ব-০৪

অনলাইন ডেস্ক
মোঃ রেদওয়ানুল হক মিলন
১৭ জুন ২০১৯, ১১:৩৬ পূর্বাহ্ণ
৬১৬
ধর্ষ

আজকাল সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে ধর্ষণের মতো সংবাদের কতো গুলো লিংক ৷ একটু পূর্বে ফিরে যায় তাহলে আপনাদের বুঝতে সহজ হবে। বছরের প্রথম প্রহরেই বাংলাদেশের প্রত্যেক খবরের কাগজে বড় করে শিরোনাম হয়ে আসলো নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ধানের শীষে ভোট দেওয়ায় স্বামী ও চার সন্তানকে বেঁধে রেখে গৃহবধুকে গণধর্ষণ৷ আহারে কি নির্দয় আমাদের কিছু মানুষরুপী বেহায়য়া যুবকরা, ধর্ষণ শব্দটি শুনলে যেকোনো নারীরই তীব্র অসহায় লাগে, অনিরাপদ অনুভূতি মাথা চাড়া দেয়৷

আমরা একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এসে মানবিক হওয়ার পরিবর্তে পাশবিক হয়ে উঠছি৷ পাশবিক আচরণের যে ধারা আমাদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া, সেটি থেকে বের হতে পারিনি এখনো আমরা৷ আর সেটির বড় শিকার নারীর সম্ভ্রম৷ এর বড় নুসরাত জাহান রাফি, পূর্ণিমা, পারুল, শিমু, না জানা আরো অনেকেই কিংবা বগুড়ার সেই মা-মেয়ে৷

ফিরে দেখাঃ ২০০১ সালঃ  অতীতে না গিয়ে আমরা ২০০১ সালের নির্বাচনেই যাই, পূর্ণিমা আমাদের কাছে এক জ্বলন্ত উদাহরণ৷ ‘সব হিন্দুরা আওয়ামী লীগে ভোট দেয়' তাই বিএনপির কর্মী খলিল, লিটন, আলতাফদের কাছে ধর্ষণ করেই প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা সহজ ছিল৷ সেটাই ঘটেছিল৷ আর জনগনের কানে বেজেছে পূর্ণিমার মায়ের আর্তনাদ, বাবারা তোমরা একজন একজন করে আসো, আমার মেয়েটা ছোট ও মরে যাবে'৷ আমাদের কিসের লজ্জা, এ লজ্জা রাষ্ট্রের৷

পূর্ণিমাদের সাজানো সংসার ছিল, বোনেদের বিয়ে হয়েছিল৷ বোন ধর্ষিত হয়েছে এই অপরাধে ফিরতে হয়েছিল পূর্ণিমার বোনদের৷ এলাকা ছাড়া হতে হয়েছিল পরিবারকে৷ এতদিনের সাজানো সংসার ছেড়ে পূর্ণিমার মাকে শুধু বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নামতে হয়েছিল৷

সব প্রতিকূলতা ছাপিয়ে পূর্ণিমা আজ সমাজের মুখে থুতু দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে কিন্তু সমাজ কী সংশোধিত হয়েছে৷ আজও পূর্ণিমাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হেনস্থা হতে হয়, কারণ তিনি ধর্ষিতা হয়েছিলেন৷ তাঁর ছবি, ফোন নম্বর ব্যবহার করে খোলা হয় পর্ন পেইজ৷ তাঁর দোষ একটাই, ধর্ষিত হয়ে তিনি তনু, বা নুসরাতদের মতো মরে যাননি, বেঁচে আছেন।

নুসরাত এ দেশের ১৬-১৭ কোটি মানুষের একজন, একজন মেয়ে। পরিচয় দেওয়ার মতো কিছু নেই তার। না ধনী কন্যা, না কোনো অভিজাত কন্যা নিতান্তই সাধারণ এক গ্রাম্য মেয়ে। এমন কত শত গ্রাম্য মেয়ে এ দেশের অসংখ্য গ্রামে ছড়িয়ে আছে তাদের আমরা চিনি না, নুসরাত তাদের একজন।

মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা তার সম্ভ্রমহানি করতে চাইল, সহজ বাংলায় যাকে বলে ধর্ষণ, ও ধর্ষিত হলো না মুখ বুজে। বরং অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে একটা মামলা করে বসল। কত বড় সাহস নুসরাতের! অধ্যক্ষ গ্রেফতার হলো। মামলা তোলার জন্য উপর্যুপরি চাপ চলল মেয়েটির ওপর। কিন্তু নুসরাত বড়ই বেয়াড়া, একদম অনড়। তার পরই চমৎকার ভাবে সাজানো হলো একটা নাটক।

নুসরাতের বন্ধুকে ছাদে ফেলে মারছে- এ খবরটি পরিবেশিত হলো নুসরাতের কানে বিশ্বাসযোগ্য করে। ছুটে গেল নুসরাত তার বন্ধুকে বাঁচানোর জন্য। আর সেখানে ছিল বোরকা পড়া চারজন, হতে পারে পুরুষ, হতে পারে নারী, তবে পশু যে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ওরা হাত-মুখ বেঁধে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে জ্বালিয়ে দিয়ে মত্ত উল্লাসে বলল, পালা।

নুসরাতের শরীরের ৮৫ ভাগ দগ্ধ হলো। মেয়েটি পানি খেতে চেয়েছিল, পায়নি। পানি পেলেই কি আর নুসরাত খেতে পারত! খাবার অবস্থা যে তার ছিল না। গালের ভিতরের পুরোটাই ছিল পোড়া। হাতের ব্যান্ডেজ খুলে দিতে বলেছিল দেয়নি, দেওয়ার অবস্থা ছিল না। মৃত্যুর সঙ্গে ধুঁকল চার দিন। সারা দেশ থমকে রইল, তার জন্য প্রার্থনা করল। কিন্তু লাভ হলো না সকল কেকাঁদিয়ে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলেন নুসরাত জাহান রাফি নামের মেয়েটি। তার জন্য দুয়া করি মহান আল্লাহ তাওলা যে বেহেশত নসিব করে।

কিন্তু একটা বিষয় ভেবে বিস্মিত হতে হয়, ধর্ষকের পক্ষে এত মানুষ! এরা কারা! কোথা থেকে আসলো এরা, মিছিলে অনেক নারীও ছিল। আচ্ছা ওদের খুঁজে বের করা, চিহ্নিত করা কি এতই কঠিন। ন্যায়-অন্যায় না দেখে যে কোনো একটা ইস্যু পেলেই মিছিল করা যাবে এ কেমন কথা? ধর্ষকের পক্ষে, হত্যাকারীদের পক্ষে মিছিল হলো আর প্রশাসন বসে বসে দেখল, আনন্দও পেল বোধ হয়!

আবার এই ধারাবাহিকতায় নিকট অতীত ঘাটলে পাই বগুড়ার ঘটনা৷ দলীয় ক্যাডার দিয়ে একজন কিশোরীকে তুলে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে৷ কয়েকদিন পর আবারো ক্যাডার দিয়ে বাড়ি থেকে তুলে এনে ধর্ষণের শিকার মেয়েটি ও তার মায়ের মাথার চুল কামিয়ে দেয়া হয়েছে৷ এরপর মা মেয়ে বাড়ি ছাড়া, তিন মাস কাটাতে হয়েছে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে৷

শুধু রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বলে চাইলেই ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটানো যায়? আর রাজনৈতিক নেতা কর্মীরা ধর্ষণকেই কেনো প্রতিহিংসার বড় অস্ত্র হিসেবে লালন করেন এই প্রশ্নের কোনও ব্যাখ্যা বা জবাব কখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি৷ আর যাবে বলে আশা করছি না।

আপনাদের হয়তো মনে আছে মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের সঙ্গে আমাদের পাওনা ২ লাখ বীরাঙ্গনা৷ যুদ্ধের ময়দানে লড়াই করার পাশাপাশি নিজেদের পৌরুষত্বের জোর পরীক্ষা করে বীরাঙ্গনাদের নারকীয় দুঃসহ জীবন ‘উপহার' দিয়ে গেছে সেই পাষণ্ডরা৷ স্বাধীন দেশে তার পুনরাবৃত্তি চলছেই৷

নিজ দেশের মানুষই কেবল ভোটাধিকার প্রয়োগের জের ধরে চার সন্তানের সামনে গণধর্ষণ করতে পারে৷ সুবর্ণচরের সেই নারীর স্বামীর দেওয়া বয়ান শোনার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য যেটাই বলেন সেটা হয়েছিল তাও আবার টিভির পর্দায়৷ অসহায় সে পুরুষ নিজ স্ত্রীকে ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেননি৷

নিম্নবিত্ত এই পরিবারটির বাস্তবতাটি কী কেউ খতিয়ে দেখছি আমরা! কোথায় যাবেন তারা? আমাদের সমাজ কী তাদেরকে মেনে নেবে, বিয়ে হবে সেই নারীর সন্তানদের পূর্ণিমাকে যেমন একঘরে করা হয়েছিল, তেমনটি হবে না আবার দেখিয়েন বাস্তবে তেমনটিই হবে৷

আমাদের সামাজিক বাস্তবতা ধর্ষিতাকে প্রতিনিয়ত ধর্ষণ করবে আচরণ দিয়ে৷ আর প্রতিহিংসা চরিতার্থের যেসব উদাহরণ রেখে যাচ্ছে আমাদের তথাকথিত রাজনীতিকরা, সেটিই চর্চিত হবে বারংবার৷

পূর্ণিমা বা পারুলদের খবর আমাদের পর্যন্ত এসেছে৷ কিন্তু আরও অসংখ্য ধর্ষণের ঘটনা কেবল ধর্ষকের সামাজিক ও রাজনৈতিক দাপটের জোরে প্রকাশিত হয় না৷ ধর্ষণের মামলা হয় না অধিকাংশ ক্ষেত্রেই৷

এবার আসুন পরিসংখ্যানে আসি৷ প্রায় সাড়ে তিন হাজার ধর্ষণ মামলার ঘটনায় সাজা পেয়েছেন মাত্র এক হাজার ৩৪৬ জন৷ অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি মামলা ধোপে টেকেনি৷ ধর্ষিতা প্রমাণ দিতে পারেননি তিনি ধর্ষিত হয়েছিলেন৷ সুতরাং সাজা হয়নি আসামির৷

আসামি ধর্ষণ করেনি এমন প্রমাণের ভিত্তিতেই ছাড়া পেয়ে গেছে অনেক আসামি ৷ ধর্ষিতা কিন্তু সমাজ ও সংসারের চোখে ধর্ষিতা হয়েই বেঁচে আছেন৷ কোথায় কেমন আছেন সেই তথ্য আমাদের কাছে নেই, বা আমরা রাখার প্রয়োজনবোধ ও মনে করি না৷ হয়তো শিগগিরই ধর্ষক রুহুল প্রমাণ করতে পারবেন তিনি ও তার সঙ্গীরা শিমুর গণধর্ষণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না৷ কিন্তু শিমুর যে তকমা লেগে গেছে৷ সেটি তো আর মুছবে না৷

তবে যতগুলো ধর্ষণের ঘটনা ঘটে তার প্রায় ৭০ শতাংশ বিচারের দ্বার পর্যন্ত আসে না৷ আমাদের সমাজের বিভিষীকাময় আচরণের কাছে বেশিরভাগ পিতামাতা ও স্বজন লুকিয়ে ফেলেন ধর্ষণের ঘটনা৷ এমনটাই ঘটে এসেছে৷

প্রকাশ্য কোনও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে হয়তো এভাবেই লুকিয়ে থাকতে হবে ধর্ষিতাকে৷ আর প্রতিহিংসা চরিতার্থের অস্ত্র হিসেবে ধর্ষণ পুরুষদের প্রথম পছন্দ হিসেবে বিবেচিত হবে৷ কারণ এই অপরাধে তো শাস্তির নজির নেই৷

লেখকঃ মোঃ রেদওয়ানুল হক মিলন

সভাপতি, বাংলাদেশ তরুন লেখক পরিষদ, ঠাকুরগাঁও জেলা।

redoanulhaquemilon@gmail.com


mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ