আমরা কষ্ট পুষি, রাগ পুষি, বলতে পারি না ভয়ে! পর্ব- ০৩

অনলাইন ডেস্ক
মোঃ রেদওয়ানুল হক মিলন
১১ জুন ২০১৯, ০২:২০ অপরাহ্ণ
৬৬৫
মোঃ রেদওয়ানুল হক মিলন

বছরের বিদায় লগ্নে ৩১শে ডিসেম্বর ২০১৮ নোয়াখালীর সুবর্ণচরে দিনের বেলা যুবতি মেয়ের সামনে মাকে দল বেঁধে ধর্ষণ করার পর প্রহার করা হয়, ১৭ কোটি মানুষ এর সাক্ষী, ধর্ষক রুহুল আমীনের ফাঁসির দাবি উঠলেও, ফাঁসি কিন্তু হয় নি। কিছুদিন আগে ঢাকার এক আবাসিক এলাকায় ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করার পর শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়, ধর্ষক আটক, তবে তার কিন্তু ফাঁসি হবে কিনা আমি জানি না।

গত গতবছরে দেখলাম ৩ বছরের শিশুর যৌনাঙ্গ ব্লেড দিয়ে কেটে ধর্ষন করে হত্যা করে নরপশু এক কুলাঙ্গার যুবক, সেই ধর্ষক যুবকও গ্রেফতার হয়েছে। গত বুধবার দেখলাম ঈদের দিন নানু বাড়িতে ঘুরতে এসে ৩ বছরের নাতনী ধর্ষণ তাও আবার নানার হাতে, শুধু নানা নয় বাবার হাতেও ধর্ষণ হচ্ছে শিশুরা।

গত কয়েক মাস আগে টিভির পর্দায় দেখলাম এক আর্মির মেজর সাহেব তার চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া কণ্যাকে ধর্ষণ করেছে এ লজ্জা রাখি কোথায়। বলা হয়ে থাকে মেয়েরা বাবা মায়ের চোখের মনি বা মেয়েদের একমাত্র আশ্রয় স্থল ও নিরাপদ বাবা মায়েই কোল, সেই বাবাই যদি তার কণ্যাকে ধর্ষণ করে বা নিরাপদ না দিতে পারে তাহলে বাকিদের কাছে কি আশা করা যায় লজ্জা আর লজ্জা।

সিলেটে দিবালোকে রামদা দিয়ে রাস্তায় প্রকাশ্যে খাদিজাকে কুপিয়ে তার মাথা কয়েকভাগ করে দিলো  সিলেটের বদরুল, খাজিদার ভাগ্য ভালো মরতে মরতে বেঁচে গেছে বদরুলেরও একটা বিচার হয়েছে, তবে খুব বেশি হয় নি।

সংরক্ষিত এলাকা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এর ভিতরে তনুকে ধর্ষন করার পর হত্যা করা হয়, কে বা কারা করেছে তা আমাদের গোয়েন্দা বাহিনীরা  ভালো করেই জানে, কিন্তু দুঃখের বিষয় কি জানেন তনুর ধর্ষনকারী এখনো গ্রেফতার হয় নি। গত বছরে বরিশালের বানারিপাড়ায় মা-মেয়েকে একসাথে ধর্ষন করে মাথা নেড়ি করে দেয় এক প্রভাবশালী তুফান, তবে তুফানের বিচার হয়েছে, কিন্তু ফাঁসি হয় নি।

এভাবে আরো কতো মা বোনেরা ধর্ষণ হচ্ছে তার হিসাব রাখে কে? ধর্ষকরা জেলে যায় ঠিকই, কিন্তু ক্ষমতার দাপট খাটিয়ে আবার বেরিয়ে আসে। আমরা ধর্ষকের ফাঁসি চাই সবাই, কিন্তু দেশে কি সেই আইন আছে? ধর্ষকের শাস্তি জনসম্মুখে মৃত্যুদন্ড মাত্র তিন চারটা দিয়ে দেখুন তো, ধর্ষনতো দূরের কথা, কোনো মায়ের দিকে চোখ তোলে তাকানোর সাহস পাবে না কোন কুলাঙ্গার।

অন্যান্য দেশের চেয়ে আমাদের দেশের আইন ভিন্ন এবং ধর্ষনের শাস্তিও ভিন্ন যেমন, আমেরিকা ধর্ষিতার বয়স ও ধর্ষনের মাত্রা দেখে ৩০ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড, রাশিয়ায় ২০ বছর সশ্রম কারাদন্ড, চীন কোনো ট্রায়াল নেই, মেডিকেল পরীক্ষার পর মৃত্যুদন্ড, মধ্যপ্রাচ্য আরব দুনিয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত পাথর ছুড়ে মৃত্যু, ফাঁসি, হাত পা কাটা, যৌনাঙ্গ কেটে অতি দ্রুততার সাথে মৃত্যুদন্ড দেওয়া, নেদারল্যান্ড ভিন্ন ভিন্ন সাজা। আবার আফগানিস্তান ৪ দিনের ভিতর গুলি করে হত্যা, মালয়শিয়া মৃত্যুদন্ড।

এখন বাংলাদেশের কথা বলি প্রথমে প্রতিবাদ তার পর ধর্না, তদন্ত, এপর কয়েকসদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন, সমঝোতার চেষ্টা ঘুষ নেওয়া দেওয়া, প্রভাবশালীদের লোক, ধমক-চমক আরো কত কি। মেয়েটির চরিত্র নিয়ে গবেষণা বোরকা পরে ছিলো কি না? সংবাদমাধ্যমে আলোচনার আসর রাজনীতি করন জামিন আবার ধর্ষন অবশেষে মেয়েটির আত্মহত্যা এটাই হলো আমাদের বাংলাদেশ।

আমাদের মা বোনদের প্রতি সহিংসতা অবিচার রন্ধ্র্রে রন্ধ্রে। তার শারীরিক অংশটা আমরা দেখি। কিন্তু মানসিক সহিংসতা আমরা দেখি না, দেখা যায় না। আমাদের মা-বোনদের ওরা পুড়িয়ে মারে, গলা টিপে মারে, গুলি করে মারে, ফ্যানে ঝুলিয়ে মারে, পিটিয়ে মারে, বিষ খাইয়ে মারে। আমাদের মা-বোনদের  ওরা মারে প্রতারণা করে, বিশ্বাসভঙ্গ করে, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। ওরা সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।

ওরা কেউ লুঙ্গি পরে, কেউ পায়জামা, কেউ প্যান্ট, কেউ স্যুট-টাই, কেউ কেউ আবার পকেটে লাল রুমাল গোঁজে। ওরা বড় বড় খুনি, বড় বড় লুটেরা, বড় বড় অভিনেতা। নিজের চারপাশটা রঙ্গমঞ্চ বানিয়ে ওরা সারাক্ষণ হাসে-কাঁদে। ওরা সর্বদলীয়, সর্বধর্মীয়। ওরা একবার বঙ্গবন্ধুর জন্য কাঁদে, একবার খালেদার জন্য কাঁদে, একবার কাঁদে এরশাদের জন্য।

একবার ওরা নাস্তিকতার বুলি কপচায় আর একবার হজ করে বকধার্মিক হয়। ওরা রিকশাওয়ালা, মুটে, মজুর, চাকরিজীবী, পেশাজীবী, ওরা সাংবিধানিক পদেও আসীন। ওদের বিরুদ্ধে কে কথা বলবে, কীভাবে কথা বলবে। কার এত সাহস। ওদের টাকা, ক্ষমতা, নোংরামি আর নৃশংসতার ভয়ে মেয়েরা কাঁপে। আমরা কাঁপি। আমিও ভয়ে কাঁপি।

তাই আমরা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে দু-চারটি লাইন লিখি বড়জোর, তাও আবার ভয়ে ভয়ে। তারপর চুপসে যাই কী জানি কী হয়। কে কোথায় রাগ করে, বিচারের আওতায় পড়ি কিনা। নিজেকে বাঁচানোর জন্য আমরা আস্তে পেছনে সরে যাই। বুকে কষ্ট পুষি, রাগ পুষি। বলতে পারি না ভয়ে।

এভাবেই আস্তে আস্তে চাপা পড়ে যায় নুসরাতের কথা, খাতিজা, রিসা, পারুল, মিতু, আর ৩ বছরের ধর্ষিত শিশুদের কথা। আমরা ওদের ভুলে যাই। ভুলে যাব।   এটাই বাস্তবতা

লেখকঃ মোঃ রেদওয়ানুল হক মিলন

সভাপতি, বাংলাদেশ তরুন লেখক পরিষদ, ঠাকুরগাঁও জেলা।

redoanulhaquemilon@gmail.com


mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ