জোট নিয়ে টানাপোড়নে বিএনপি, ঘুরে দাঁড়ানোর চেয়ে 'কামাল' প্রেমে মগ্ন দলটি!

শাহ আহমদ সাজ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক পাড়ায় অনেক পার্থক্য দেখে দিয়েছে। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আদর্শ পরিবর্তন ছিল লক্ষ্যণীয়। বিভিন্ন দল ও জোটের গতিপথ পরিবর্তন হতেও দেখা গিয়েছিল। এরপর সব কিছুতেই যেন পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে যায়। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বন্দী করা থেকে শুরু করে সাজা দেওয়া সব ছিল পরিবর্তনের অংশ।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিসহ তাদের মিত্ররা অংশ না নিলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। নির্বাচনে অংশ নেওয়াটাও ছিল একধরনের রাজনৈতিক চমক। চমক সৃষ্টির পেছনে মূল তরী ছিল ঐক্যফ্রন্ট আর চালকের ভূমিকায় যৌথভাবে ছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আইনজীবী ড.কামাল ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নির্বাচনের সকল নাটকীয় কর্মকাণ্ড সম্পর্কে দেশবাসীর জানা আছে।

একটি গনতান্ত্রিক দেশে কিভাবে প্রকাশ্যে দিবালোকে জনগণকে তার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলো, কিভাবে বিরোধী দল সমূহের প্রার্থীদের পিটিয়ে ভোটের মাঠ থেকে বিতারিত করা হলো, কি কারণে এক দলীয় পোস্টারে সারাদেশ ছেয়ে গিয়েছিল, কিভাবে সারা দেশের বিরোধী নেতাকর্মীদের ঘর ছাড়া করা হয়ে ছিল, কিভাবে নিরীহ সাধারণ মানুষদের গ্রেফতার করা হয়ে ছিল, কিভাবে সরকার দলীয় লোকেরা রাতের মধ্যে ভোট কাস্ট করলো এসব সম্পর্কে বলার প্রয়োজন মনে করিনা। তবে এটুকুই বলতে চাই বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্কিত দিন ছিল ৩০ ডিসেম্বর। মানুষ সব জেনেশুনে আজ ভয়ে কথা বলার সাহস হারিয়ে ফেলেছে।

আর যারা কথা বলতে চেষ্টা করছে তাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্পর্কেই আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকতে চাই। আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে শুরুতেই বড় পরিবর্তন আনে। দশম জাতীয় নির্বাচনের পর যেসকল বাম দলের নেতা মন্ত্রী পরিষদে ছিলেন তাদের ছাটাই করে। বলা যায় আওয়ামী লীগ এখন নিজেদের নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চায়। অনেকে বলছেন হাসানুল হক ইনু, মেনন ও দিলীপ বড়ুয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতেই হয়তো এই উদ্যোগ। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন কোন দলই চায় না অন্য কোন দল বেশি ক্ষমতা দেখাক! তবে তাদের মহাজোট এখনো বহাল রয়েছে।

আওয়ামী লীগ বা মহাজোটের রাজনীতিতে এই ছোট পরিবর্তন ছাড়া তেমন বড় কোন পরিবর্তন দেখা যায়নি। এদিকে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়। জোটে দেখা দিয়েছে ভাঙনের সম্ভাবনা। ইতোমধ্যে ২০ দলের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ জোট ছেড়ে দিয়েছেন মর্মে গণমাধ্যমে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছেন। তার সেই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বেশ কিছু বিষয় স্থান পেয়েছে।

বিরোধীদলীয় রাজনীতি অতিমাত্রায় ঐক্যফ্রন্টমুখী হওয়ায়, ২০ দলীয় জোটের অবমূল্যায়ন, সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের প্রহসনের ও ভোট ডাকাতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ২০ দলীয় জোটের সবার সম্মতিক্রমে এই নির্বাচনকে প্রত্যাখান করার পরেও প্রথমে ঐক্যফ্রন্টের দুইজন এবং বিএনপির সম্মতিতে দলটির চারজন সংসদ সদস্য শপথ নেওয়া। বিভিন্ন গণমাধ্যমে আন্দালিব রহমান পার্থ বলছেন, জোটে থেকে আর প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের সমালোচনা করা যাবে তাই তিনি জোট ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

এদিকে লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বিএনপিকে ঐক্যফ্রন্ট ছাড়ার জন্য সময় বেধে দিয়েছেন। রাজনৈতিক পাড়ায় গুঞ্জন রয়েছে এরকম আরো কিছু দল জোট ছেড়ে যেতে পারে। জোটের পাশাপাশি বিভিন্ন দলের মধ্যেও চলছে নানা পরিবর্তন। বহু নাটকীয়তার পর জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হলেন হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদের আপন ভাই জিএম কাদের। যদিও পূর্বে রওশন এরশাদ চেয়ারম্যান হওয়ার খবর প্রকাশ হয়েছিল। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে জামায়াতের মধ্যে।

জামায়াতের বহিস্কৃত নেতা সাবেক শিবিরের সভাপতি নতুন দল গঠন করেছেন। এরই মধ্যে জামায়াতের সিনিয়র আইনজীবী ও এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেছেন। সহকারী সেক্রেটারির পদত্যাগ, ছাত্র সংগঠনের সাবেক সভাপতির নতুন দল গঠন, নিজেদের মধ্যে সংস্কার নিয়ে আলাপ আলোচনা এসব কিছু প্রমাণ করে জামায়াত নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় রয়েছে। ঐক্যফ্রন্ট একটি অনিশ্চয়তার পথ। এই অনিশ্চয়তার পথ পরিহার করা ভালো।

ড.কামাল সাহেবের অবসরের পর এই ফ্রন্ট অঘোষিত বাতিল বলেই গণ্য হবে। এদিকে ঐক্যফ্রন্টের কারণে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের দুই একজন ছাড়া রাজনীতির চলতি আসরে তেমন কেউ জায়গা পাচ্ছেন না। এই জায়গা না পাওয়াটা তাদের আগামীর জন্য ক্ষতিকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জোটেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। ঐক্যফ্রন্ট কোন কাজে না আসলে তার সমাপ্ত হওয়া জরুরি। এদিকে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির সামনে এখন অগ্নিপরীক্ষা। বিগত একযুগেরও বেশি সময় থেকে ক্ষমতার বাহিরে থাকার ফলে দলের মধ্যে অনেকটা শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। জোটের মধ্যেও চলছে টানাপোড়েন।

এমতাবস্থায় দল ও জোট সামলানোর পাশাপাশি পুনরায় রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে বিএনপি জনসাধারণের দল। দেশের বিরাট একটা অংশ বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পর্ক নেই কিন্তু ভোটের হিসেবে বিএনপির পক্ষের লোক। সরকারের স্বৈরাচারী পদ্ধতিতে দেশ পরিচালনা ও ভোটাধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগতো আছেই।

মানুষ আজ নীরবে সুসময়ের প্রহর গুনছে। মানুষ অপেক্ষায় আছে বিএনপি সকল অপশাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। সেই রুখে দাঁড়ানোর অবস্থানে কি আছে বিএনপি? উত্তরটার জন্য আপাতত অপেক্ষা ছাড়া এর চেয়ে বেশি কিছু নয়!

লেখক: সাংবাদিক ও সম্পাদক।


mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ