ভাল থাকবেন সবাই

কাজ
আমেরিকায় এসেছিলাম ১১ই মার্চ। পাঁচ মাসের অধিক হয়ে গেলো এখন যাওয়ার সময় হয়েছে, যাদের সাথে বাংলাদেশে থাকতে পরিচয় ছিল এবং এবারে এসে নতুন করে যাদের সাথে পরিচয় হয়েছে সবার থেকেই বিদায় নিচ্ছি, জানি না আবার ফিরে আসতে পারব কিনা, আবার আপনাদের সাথে দেখা হবে কিনা, আবার জ্যাকসন হাইটসের শাহী পানের দোকান থেকে পান খেতে পারব কিনা, আবার খাবার বাড়ী রেষ্টুরেন্টে বসে আড্ডা হবে কিনা।

এর আগেও দুইবার আমেরিকা এসেছি, তখন আমেরিকাকে এতোটা জানতে পারিনি, এবার যতটা জেনেছি। অভিজ্ঞতার ঝুলিতে আমেরিকা সর্ম্পকে অনেক কিছু জমা হয়েছে, এবারের এই দীর্ঘ সময়টা আমার পরিবারের সমস্ত সদস্যদের নিয়ে আনন্দেই কেটেছে, আবার কবে কখন পরিবারের সকল সদস্য একত্রিত হব জানা নেই। এই সময় আমেরিকা থেকে কিছু দেখা, কিছু অভিজ্ঞতা আমাকে বিস্মিত করেছে, আমেরিকা ছাড়ার পূর্বে দারুনভাবে ইচ্ছা হচ্ছে এই দেখা এবং অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের জানাতে। একটা দেখার কথা জানানোর পূর্বে বর্তমান সারা পৃথিবীতে তথা আমাদের উপমহাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে একটু ভূমিকার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি।

পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই জন্মের পর থেকে তাদের পিতা-মাতার পরিচর্চা এবং আদর ¯েœহে বড় হতে থাকে, আর এই বড় হতে থাকা সময়ে মা-বাবার থেকে শিখে ফেলে তার ভাষা, বড় হয়ে ধীরে ধীরে জ্ঞান লাভ করার সময়ে তারা অনুগত হতে থাকে তার পিতা-মাতার পালন করা ধর্মে। সাধারণত প্রায় প্রতিটি ধর্মেই নতুন করে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোন দীক্ষা গ্রহণ করতে হয় না, পিতা-মাতা থেকে প্রাপ্ত ধর্মের রীতিনীতি শিখেই বড় হয়ে উঠে প্রতিটি মানুষ। এরপরে শিক্ষা ও জ্ঞান লাভের পরে অনেকেই ধর্মীয় আনুগত্যতা বাড়িয়ে হয়ে জান গোড়া ধর্মাবলম্বী। আবার কেউ নিজ ধর্মে বর্ণিত সৃষ্টিকর্তা অথবা ধর্মীয় দেবতা কিংবা গুরুর প্রতি আস্থা হারিয়ে হয়ে যান নাস্তিক। আমি দুই দলের কোন দলেরই মানুষ নই, পিতা-মাতা থেকে প্রাপ্ত ধর্মের প্রতি অনুগত থেকে তার রীতিনীতি যথা সম্ভব মেনে চলার চেষ্টা করি, কোন পথে চলা উৎকৃষ্ট এ কথা নিয়ে গবেষণা করতে চাই না। জন্মগত সূত্রে যা পেয়েছি তার মধ্য থেকেই শান্তি খুজে নিতে চাই, যদিও শান্তি দেখা যায় না স্পর্শ করা যায় না, শান্তি শুধুই অনুভূতির বিষয়, জানি শান্তি খুজে পাওয়া খুবই কঠিন। তবুও শান্তিতে থাকার বৃথা চেষ্টা করি অনেক। পৃথিবীতে প্রতিটি ধর্মই এসেছে মানুষের কল্যাণ এবং শান্তির জন্য। কিন্তু মানুষ কি সবাই শান্তিতে আছে।

সেই প্রশ্ন মাথায় রেখেই বিস্মৃত হয়েছি, অবাক হয়েছি, আটলান্টিক এভিনিউ এর ১২৭ নং ষ্ট্রিটের রাস্তার এক পার্শ্বে গির্জা, অপর পাশে মন্দির। মন্দিরের পাশে একটি বিল্ডিং এর পরে একটি বিরাট মসজিদ দেখে। এই স্থানটির পাশ দিয়ে হেটেছি অনেক, দেখা হয়েছে মন্দিরের পূজারীদের সাথে, দেখা হয়েছে মসজিদের মুসল্লীদের সাথে, দেখেছি র্গীজায় উপাসনায় আগমনকারী অনেক খৃষ্টান ধর্মাবলম্বী মানুষদের। জিজ্ঞেস করেছি অনেককে, এখানে কি কখনো তিন ধর্মের লোকেদের মধ্যে বিবাদ হয়েছে, সবাই বলেছে না, কখনো দেখি নাই শুনিও নাই। এটা মনে হয় পৃথিবীতে একটি শান্তির বার্তা। আমি আমেরিকা ছাড়ার পূর্বে আটলান্টিক এভিনিউ এর ১২৭ নং ষ্ট্রিটকে শান্তির প্রতীক হিসেবে জেনে গেলাম। ধন্যবাদ  জানাই নিউইয়র্ক সিটির সেই মেয়রকে যিনি পাশাপাশি মসজিদ, মন্দির, গির্জা স্থাপনের অনুমতি দিয়েছিলেন।

পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই এখন সভ্যতার আওতায় এসে গেছে। যারা সভ্যতার আওতাভূক্ত মানুষ তাদের প্রত্যেক সমাজে অথবা দেশে শিশুদের অনেক অধিকার। কারণ শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যত। তাই তাদের জন্য সুষ্ঠু, সুন্দর আইন প্রণোয়ন করে তাদের সামাজিকভাবে লালন করা হয়। আমেরিকায় শিশুরা যে অধিকার নিয়ে বড় হচ্ছে তা সত্যিই বাংলাদেশের একজন নাগরিক হয়ে ভাবতে পারিনা। ভাবনা হয় কবে আমাদের দেশের শিশুরা ্এই অধিকার পাবে, স্কুলের পথে দাড়িয়ে থেকে শুধু শিক্ষার্থীদের  জন্য আলাদা ট্রাফিক, অনেক সময় ট্রাফিকরা হাত ধরে পার করে দেয় স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে। স্কুলে দুই বেলা খাবারসহ পাঠ দান, স্কুলে তিন দিন অনুপস্থিত থাকলে পিতা-মাতা বা লিগ্যাল অভিভাবকের কাছে ফোন করে স্কুল কর্তৃপক্ষ জেনে নেয় শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতির কারণ। শুনেছি আমাদের দেশে শিশুদের স্কুলে খাবার ব্যবস্থা হচ্ছে, যদি বর্তমান সরকার এটা করতে পারেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। আমাদের শিশুরা খাবারের অভাব নিয়ে যেন বড় না হয়, আমাদের শিশুরা যেন মায়ের গর্ভে আসার সাথে সাথে উপযুক্ত পরিমাণ প্রোটিন পেতে থাকে, আমাদের শিশুরা যেন কখনো ধর্ষিতা না হয়, আমাদের শিশুরা যেন অপহরণের শিকার হয়ে টুকরো টুকরো লাশে পরিণত না হয়। অপরাধ সব দেশে হতেই পারে, খুন, অপহরণ, রাস্তায় দূর্ঘটনা সব দেশেই হয়ে থাকে, এইসব অপরাধ দমনের জন্য সকল দেশেই আইন আছে, আইনের সঠিক প্রয়োগ আছে। আমাদের দেশেও যেন দৃশ্যত আইনের প্রয়োগ থাকে। আমেরিকায় পিতা-মাতাও যদি শাসনের নামে সন্তানদের নির্যাতন করে, সেই নির্যাতনের কথা যদি সন্তান পুলিশকে জানিয়ে দেয়, পুলিশ প্রমাণ পেলে মা-বাবাকেও বিচারের সম্মুখীন হতে হয় একথা আমাদের দেশের মা-বাবারা কি ভাবতে পারেন! তাদের ধারনা আমি জন্ম দিয়েছি আমার সন্তানকে, তার সমস্ত ভাল মন্দের দায়িত্ব আমার, অতএব আমার সন্তানকে আমি যা খুশি তাই করতে পারি। পিতা-মাতার এমন ভাবনা কি ঠিক? সন্তান হলেও জন্ম নেওয়ার পরেই প্রত্যেকটি শিশু একেকটা একক মানুষ, জন্মগত ভাবে প্রত্যেকটি শিশু অনেক মানবিক অধিকার নিয়ে জন্ম নেয়, এই অধিকার থেকে কোন প্রকার বঞ্চিত হলে প্রত্যেকটি সভ্য দেশে বঞ্চনার শিকার প্রত্যেকটি শিশু উপযুক্ত বিচার পায়। আশা করি এমনটি আমাদের দেশেও একদিন হবে।

অনেক কিছুই অবাক করেছে, অনেক কিছুই বিস্মিত করেছে, লিখলে অনেক কিছু লেখা যাবে। সব শেষে লিখতে চাই, এখানকার বাঙালীদের সমিতিগুলো দেখে, কত সমিতি আছে আমার জানা নেই, অনেকেই হয়ত এতো সমিতি থাকার বিষয়ে সমালোচনা করে থাকেন, আমি করব না। কারণ আমার দৃষ্টিতে এতো সমিতি থাকা খারাপ কিছু নয়। সম গোত্রীয় অথবা একই এলাকায় বসবাসকারী মানুষরা একত্রিত হয়ে একটা সংগঠন করতেই পারে, প্রবাসে মৃত্যু, অসুস্থতা অথবা কোন একটি শ্রেণী দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হলে, তখন যাতে এই প্রবাসে বসবাসকারী মানুষটি একাকিত্ব বোধ না করে, বিপদের দিনে সমিতির সবাইকে কাছে পায়, সেই জন্যেইতো সমিতি। সমিতি মানুষের কল্যাণের জন্য। এই যে গ্রীষ্মকালে প্রত্যেক সপ্তাহ শেষে অনেক অনেক সমিতির অনেক অনেক পিকনিক, সমিতি না থাকলে এসব কি ভাবা যায়? প্রবাসে থেকে বছরে একটা দিন বাংলাদেশী প্রতিবেশীর সাথে দেখা সাক্ষাত, হরেক রকমের খেলা, বিভিন্ন প্রকার বিনোদনে ভরপুর একটা দিন খারাপ কি? অনেক সমিতি, অনেক আনন্দ। এই উন্নত দেশে আমার দৃষ্টিতে ভালই আছেন আপনারা। তবে সমিতি নিয়ে কোন্দল থাকা ভাল না, হোক না অসংখ্য সমিতি, শত্রুতা না করে প্রত্যেক সমিতির কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য প্রত্যেকেরই সহযোগিতা করা উচিত বলে আমি মনে করি। অনেক বিষ্ময়ের দেশে আছেন আপনারা। শত্রু নয়, বন্ধু এমন উদার এবং উন্নত হোক আপনাদের মন-মানসিকতা। আপনাদের অনেকের সাথে আর কখনো কোথাও দেখা হবে কিনা জানি না। আপনারা ভাল থাকবেন সবাই।


mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ