হাইকোর্টের রায়ের পর আইন সংশোধন, কমবে মামলার জট

হাইকোর্ট

দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালসমূহে বিচারাধীন রয়েছে লক্ষাধিক মামলা। এর মধ্যে বহু পরিবার তাদের দম্পত্য কলহ থেকে ফিরে এসে আবারও একত্রে বসবাস করতে চাইলেও আইনে আপসের বিধান না থাকায় সেটি পারতো না। চলতি মাসের ১২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিপরিষদ সিদ্ধান্ত নিয়ে এ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার অপরাধসমূহ আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুযোগ সৃষ্টি করায় মামলার জট কমবে, তেমনি বিবাদমান ঘরে শান্তি ফিরে আসবে।

হাইকোর্টের রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, যৌতুকের দাবিসহ যে কোনো অজুহাতে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর ওপর শারীরিক নির্যাতন নিঃসন্দেহে নিন্দনীয় ও গর্হিত অপরাধ। একটি সংসার ভেঙে গেলে তার পারিবারিক ও সামাজিক নেতিবাচক দিক সুদূর প্রসারী। এতে শুধু সামাজিক, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ই ঘটে না তাদের সন্তান এমনকি স্বজনদের ওপরেও এর গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যা পূরণ করা কঠিন। এ অপরাধের পরেও যদি স্বামী-স্ত্রী নিজেদের ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে দাম্পত্য জীবন অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সে ক্ষেত্রে আইনের বিধান যত কঠোর হোক না কেন তা একটি সংসার রক্ষার চাইতে বড় হতে পারে না।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালসমূহে লক্ষাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সরকার উক্ত আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার অপরাধসমূহ আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুযোগ সৃষ্টি করায় ট্রাইব্যুনালে মামলার জট কমবে। তেমনি বিবদমান ঘরে শান্তি ফিরে আসবে।

উল্লেখ্য, চার লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে স্বামী শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা করেন স্ত্রী লাভলী আক্তার। ওই মামলায় শফিকুলকে তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন আদালত। কিন্তু নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে ১১ (গ) ধারার অপরাধের ক্ষেত্রে আপসের বিধান না থাকায় তারা আবার একত্রে বসবাস করার সুযোগ পাননি। পরে বিচারিক আদালতের সাজার ওই রায় বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন শফিকুল। উচ্চ আদালতে মামলাটি বিচারাধীন থাকাবস্থায় লাভলী আক্তার হলফনামা দাখিল করে বলেন, মামলা চলাকালীন সময়ে দুই পক্ষের সব ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়েছে। তারা বর্তমানে একত্রে বসবাস করছেন ও দাম্পত্য সম্পর্ক বলবৎ আছে। তাই উচ্চ আদালতে আপসমূলে মামলাটি নিষ্পত্তির প্রার্থনা করেন তারা (স্বামী স্ত্রী) উভয়ে। ওই হলফনামা গ্রহণ করে ২০১৯ সালের এপ্রিলে বিচারিক আদালতের (ট্রাইব্যুনাল) দেয়া সাজার রায় বাতিল করেন হাইকোর্ট।

একই সঙ্গে, রায় হাতে পাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ১১ (গ) ধারার অপরাধ আপসযোগ্য করতে সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশনা দেন। ওই রায় ঘোষণার পর সম্প্রতি সরকার বিদ্যমান আইনে সংশোধনী এনে ওই ধারার অপরাধ আপসযোগ্য করেছেন।

নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ১১ ধারায় যৌতুকের জন্য মৃত্যু ঘটানো ইত্যাদির শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যদি কোনো নারীর স্বামী অথবা স্বামীর পিতা, মাতা, অভিভাবক, আত্মীয় বা স্বামীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি (যৌতুকের জন্য উক্ত নারীর মৃত্যু ঘটান বা মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টা করেন কিংবা উক্ত নারীকে মারাত্মক জখম করেন বা সাধারণ জখম করেন) তাহলে উক্ত স্বামী, স্বামীর পিতা, মাতা, অভিভাবক, আত্মীয় বা ব্যক্তি—

(ক) মৃত্যু ঘটানোর জন্য মৃত্যুদণ্ডে বা মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং উভয় ক্ষেত্রে উক্ত দণ্ডের অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।

(খ) মারাত্মক জখম করার জন্য যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে অথবা অনধিক বার বছর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং উক্ত দণ্ডের অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।

(গ) সাধারণ জখম করার জন্য অনধিক তিন বছর কিন্তু অন্যূন এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং উক্ত দণ্ডের অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।গত (১২ অক্টোবর) সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ১১ (গ) ধারার উল্লিখিত অপরাধ আপসযোগ্য হবে বলে অনুমোদন দেয়া হয়। পরে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে তা কার্যকর হয়। এর আগে ওই ধারার অপরাধ আপসযোগ্য ছিল না।

১১ (গ) ধারাটি আপসযোগ্য করার ক্ষেত্রে হাইকোর্টের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চের দেয়া রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, যৌতুকের দাবিসহ যে কোনো অজুহাতে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর ওপর শারীরিক নির্যাতন নিঃসন্দেহে নিন্দনীয় ও গর্হিত অপরাধ। একটি সংসার ভেঙে গেলে তার পারিবারিক ও সামাজিক নেতিবাচক দিক সুদূর প্রসারী। এতে শুধু সামাজিক, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ই ঘটে না তাদের সন্তান এমনকি স্বজনদের ওপরেও গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যা পূরণ করা কঠিন।এ অপরাধের পরেও যদি স্বামী-স্ত্রী নিজেদের ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে দাম্পত্য জীবন অব্যাহত রাকার সিদ্ধান্ত নেয় সেক্ষেত্রে আইনের বিধান যত কঠোর হোক না কেন তা একটি সংসার রক্ষার চাইতে বড় হতে পারে না।

এসএম/আওয়াজবিডি


অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
https://www.awaazbd.net/author/awaazbd-online-news

আওয়াজবিডি অনলাইন ডেস্ক

mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ