ঈদ আনন্দের পরিবর্তে ওদের বাঁচার লড়াই

২০০
লড়াই
ছবি- আওয়াজবিডি

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি::রাত পোহালেই দেশে পবিত্র ঈদুল আযহা উদযাপন করা হবে। এজন্য চলছে জোর প্রস্তুতি। করোনাভাইরাসের ভয় উপেক্ষা করে হাট-বাজারে ছুটছেন মানুষ। তবে ব্যতিক্রম সুনামগঞ্জের দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা। গত মাসে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর ভারি বৃষ্টিতে সৃষ্ট তিন দফা বন্যায় বিপর্যস্ত মানুষ এখনো দুর্ভোগে আছেন।

বানের পানিতে কারো বাড়ি ভেঙেছে, আবার কারো ঘরে খাবার নেই। কেউ পানিবাহিত রোগ নিয়ে বিছানায় কাতরাচ্ছেন, কেউ রোজগারের আশায় দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন। এমন অবস্থায় ঈদের আনন্দ অনেকটা ভাটা পড়েছে। তবুও বন্যা আর করোনায় বিপর্যস্ত খামারি ও কৃষকরা নিজেদের পশু নিয়ে হাটে যাচ্ছেন। আসছেন ক্রেতারাও। ধর-দাম করছেন পছন্দ হলে কিনছেনও কেউ কেউ।

বন্যার ক্ষত আর করোনা ভীতি কাটিয়ে মানুষ কিছুটা দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও বিপর্যস্ত অবস্থায় আছেন উপজেলার নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। মাসব্যাপী বানের পানিতে বন্ধি থাকায় আর্থিকভাবে মারাত্নক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন তারা। কাজকর্ম করতে না পারায় ধারদেনা করে পরিবারে যোগান দিয়েছেন কেউ কেউ। তবে অধিকাংশ বানভাসীদের দিন কাটছে অনাহারে-অর্ধাহারে। বন্যায় ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বানভাসী অনেকেই এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। এমন সংকট অবস্থায় ঈদ উৎযাপন তাদের কাছে কেবল বিলাসিতা মাত্র। বানভাসী এসব পরিবারে ঈদ আনন্দ উৎযাপনের পরিবর্তে চলছে বাঁচার লড়াই।

পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের চন্দ্রপুর গ্রামের শফিক আলী বলেন, করোনার কারনে এমনিতেই খেয়ে না খেয়ে থাকতাম। এর মধ্যে একটানা তিনবার বন্যায় আমি একেবারে বিপর্যস্ত। পরিবারের ৭ জন সদস্য নিয়ে ছোট এক ঘরে থাকতাম। বন্যায় আমার ঘর ভেঙ্গে নড়বড়ে হয়ে গেছে। পরিবারের খাদ্যজোগান দিতে এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছি। এমন অবস্থায় ঘর মেরামত কিভাবে করবো সেই চিন্তায় ঘুম হয় না। এমন অবস্থায় সরকারী পুণর্বাসন সহযোগীতা চান তিনি।

পাগলা উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া আয়শা বেগম ও কাছম আলীর স্ত্রীর বলেন, বন্যার একমাস পেরিয়ে গেলে ও সরকারী ত্রান জুটেনি তাদের ভাগ্যে। এদিকে আয় রোজগার না থাকায় মানবিক বিপর্যয়ে পড়েছেন তারা। ফলে শিশু সদস্যদের নতুন জামা কিনে দিতে না পারায় কষ্টের সীমা নেই আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থানরত এই বানভাসীদের।

এদিকে বন্যার মারাত্নক প্রভাব পড়েছে ব্যবসা বানিজ্যে ও। প্রতিবছরই ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে এমন সময় বেচাকেনার ধুম পড়ে উপজেলার হাঁট-বাজারে। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ভীড় থাকতো বিপনীগুলোতে। সন্দেশ-পিঠা ও মসলার খরচ করতে ও ক্রেতাদের ভীড় লেগে থাকতো ভেরাইটিজ ষ্টোরগুলোতে। তবে এবছর বেচাকেনা খুবই কম হওয়ায় হতাশ ব্যবসায়ীরা ও। মোটা অঙ্কের টাকার পণ্য দোকানে আমদানী করলে ও ক্রেতা কম হওয়ায় পণ্য বিক্রি আশানুরুপ হয় নি। ফলে মারাত্নক দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।

হাই চয়েজের স্বত্তাধিকারী আক্তার আহমেদ জানান, ঈদ উপলক্ষ্যে বাড়তি টাকা ধারদেনা করে পণ্য তুলেছি। কিন্তু আশানুরুপ বেচাকেনা হয় নি। তাই ধারের টাকা পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছি। ব্যবসার এমন বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে টানা তিনদফা বন্যা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন তিনি।

এরই মধ্যে এক মাসের অধিক সময় স্থায়ী হওয়া এবারের বন্যাকে ২০০৪ সালের বন্যার সঙ্গে তুলনা করছেন কেউ কেউ। ফলে এবার মানুষের দুর্ভোগের কথা উল্লেখ করে বন্যা পরবর্তী পুণর্বাসন দিতে এবং দুর্গত অঞলে নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি ডা. শাকিল মুরাদ আফজাল বলেন, এবছরের বন্যার স্থায়ীত্ব বেশি হওয়ায় আমাদের উপজেলার মানুষ মারাত্নক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। ২০০৪ সালের পর বন্যায় এতো ক্ষয়ক্ষতি বিগত কোনো বছরে হয় নি। কাজেই বিপদগ্রস্ত মানুষদের সরকারী ত্রানসামগ্রীর পাশাপাশি বন্যা পরবর্তী পুনর্বাসন দিতে ও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

এ ব্যাপারে উপজেলা দুর্যোগ ও ত্রান কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন ভূঁইয়া জানান, বন্যাকবলিতদের মাঝে উপজেলায় ৬৬ মেট্রিক টন চাল ও নগদ সাড়ে ৪ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তবে বন্যা পরবর্তী পুণর্বাসনের কোনো বরাদ্দ উপজেলায় এখনও আসে নি। যদি বরাদ্দ আসে তবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে তা বন্টন করে দেওয়া হবে।

এসএম/আওয়াজবিডি

ads