চিকিৎসার জন্য বিদেশ কেন যেতে হয়

৫৬০
চিররঞ্জন সরকার

বাংলাদেশে যারা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত, তাদের অনেকেরই চিকিৎসা নেওয়ার জন্য থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় ছুটে যাওয়ার বিষয়টি নতুন কোনো বিষয় নয়। ব্যক্তিগত টাকা খরচ করে যে কেউ যেকোনো দেশে চিকিৎসা নিতে পারেন। এটা নিয়ে বলার কিছু নেই।

কিন্তু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কিংবা কোনো মন্ত্রী, এমপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীরাও যখন অসুস্থ হয়ে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যান, তখন দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রায় সতেরো কোটি মানুষের দেশে আমাদের নেতানেত্রীরাও অসুস্থ হবেন, এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে হবে কেন? তাদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা কি দেশে নেই?

তাহলে প্রতি বছর লাখো কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করে কার বা কীসের উন্নয়ন করছি আমরা? নেতানেত্রীদের বাইরের দেশে চিকিৎসা করানোটা খুবই দৃষ্টিকটু এবং লজ্জার বিষয়। ব্যর্থতারও চিত্র। একটি ভালো মানের হাসপাতাল তৈরির ব্যর্থতা। বিদেশে চিকিৎসা করানোর মধ্য দিয়ে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি নেতানেত্রীদের অনাস্থাই প্রকাশ পায়। বিদেশে চিকিৎসা করাতে যাওয়া মানেই হলো দেশের চিকিৎসা নিরাময়যোগ্য নয়। অথচ আমরা জানি, আমাদের প্রিয় নেতানেত্রীরা যেসব রোগের চিকিৎসার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যান, তাদের রোগগুলো মোটেও বিরল নয়।

চোখ, কিডনি সমস্যা, হাঁটুর সমস্যা, হার্টের বাইপাস, প্রোস্টেট সমস্যা ইত্যাদি বয়সকালীন রোগগুলো দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষেরই রয়েছে। পঞ্চাশ-ষাট বছরের ঊর্ধ্বে যাদের বয়স, এর অধিকাংশকেই এ ধরনের সমস্যায় ভুগতে দেখা দেয়। বর্তমানে এ ধরনের সমস্যার বা রোগের চিকিৎসা বাংলাদেশেই হচ্ছে। দেশে চিকিৎসা করে অনেকে সুফলও পাচ্ছেন। দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল হাসপাতাল-ক্লিনিকের চিকিৎসাব্যয়ও ইউরোপের যেকোনো দেশে চিকিৎসাব্যয়ের চেয়ে সাশ্রয়ী। সাধারণ মানুষ যদি দেশে চিকিৎসা করে সুস্থ হতে পারেন, তাহলে নেতানেত্রীরা তা পারেন না কেন?

আমাদের জাতীয় নেতানেত্রীরা দেশে চিকিৎসা করালে তো সাধারণ মানুষের চেয়ে আরও কয়েক গুণ ভালো চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব! কারণ নেতানেত্রীদের চিকিৎসকরাও গুরুত্ব দেন। তাদের সেবা করার সুযোগ পেলে দেশের অনেক চিকিৎসকই বর্তে যান! কিন্তু তারপরও তারা চিকিৎসার জন্য বিদেশে ছুটে যান কেন? তারা পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত রাষ্ট্রে সর্বাধুনিক চিকিৎসাসেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসবেন, তারপর দেশের সাধারণ মানুষকে সস্তায় উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার স্বপ্ন দেখাবেন, এর চেয়ে বড় প্রহসন, প্রতারণা আর কী হতে পারে?

এ কথা ঠিক যে, বিরল ও জটিল কিছু রোগের ক্ষেত্রে আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থা হয়তো এখনো আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছায়নি। তাই বলে সাধারণ রোগ-ব্যাধির নিরাময় দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় হয় না এটা মেনে নেওয়া কঠিন। গরিব মানুষের জন্য কিছুটা ব্যয়বহুল হলেও আমাদের দেশেও ভালো মানের অনেক চিকিৎসাকেন্দ্র ও চিকিৎসক আছেন। আর তারা আছেন বলেই এখনো দলে দলে শবযাত্রা হয় না! আর যদি ধরেও নিই যে, দেশের চিকিৎসাসেবার মান খারাপ, তাহলেও প্রশ্ন জাগে, এই মান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না কেন? স্বাধীনতা অর্জনের প্রায় পাঁচ যুগ পরেও কেন এমন একটি হাসপাতাল গড়ে তোলা সম্ভব হলো না, যেখানে মন্ত্রী, এমপি ও নেতানেত্রীরা উন্নত চিকিৎসা নিতে পারেন?

আমাদের নেতানেত্রীরা নিজেদের জনগণের সেবক হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। বিভিন্ন জনসভায়, উৎসব-অনুষ্ঠানে সাধারণ মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। অথচ সাধারণ মানুষকে ভালো চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে নিজেরা ঠিকই মানসম্মত চিকিৎসার জন্য উন্নত বিশ্বের হাসপাতালে ছুটে যান। এটা কোন ধরনের জনসেবা? জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য নিবেদিত এসব নেতানেত্রীই তো বিভিন্ন সময় ক্ষমতায় ছিলেন। তারা কেন দেশে একটি উন্নত মানের হাসপাতাল তৈরি করতে পারেননি, যেখানে যেকোনো রোগের উন্নত চিকিৎসা হয়?

দেশের প্রায় নব্বই ভাগ মানুষ যাদের বিদেশে উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য নেই, তাদের অনিশ্চিত চিকিৎসার মুখে ফেলে, নিজেরা প্রচুর অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার সময় তাদের বিবেকে কী একটুও খচখচানি অনুভব হয় না? স্কুলজীবনে দেখেছি, দেশে কেবল হাতেগোনা কয়েকটা মেডিকেল কলেজ। কোনো কোনো জেলা ও মহকুমা শহরে ছিল সদর হাসপাতাল। সেগুলোতে কর্মরত ছিলেন এমবিবিএস ডাক্তাররা। বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা শুধু ঢাকায় থাকতেন। বিদেশে চিকিৎসার জন্য কেউ গেছেন এমন কথা খুব কম শুনতাম। হয়তো গেছেন, আমরা শুনিনি। আমাদের কানে আর কতটা আসত!

এখন তো দেশে মেডিকেল কলেজ, প্রাইভেট ক্লিনিকের ছড়াছড়ি। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ক্ষুদ্র বাংলাদেশে একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, ৩২টি সরকারি ও ৬৭টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ১৮টি বিশেষায়িত চিকিৎসা ইনস্টিটিউট, ৬৪ জেলায় জেনারেল হাসপাতাল, উপজেলা, ইউনিয়নে ছোট-বড় ৪ হাজার হাসপাতাল ও ক্লিনিক বিদ্যমান। এসব হাসপাতালে ৬০ হাজার নিবন্ধিত চিকিৎসক রয়েছেন। দেশসেরা মেধাবীরা চিকিৎসাবিজ্ঞানে অধ্যয়নের সুযোগ পান।

প্রতি বছর স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেটের একটা বড় অংশ বরাদ্দ করা হয়। তারপরও কেন আমাদের জাতীয় নেতানেত্রীরা এ দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না? এর চেয়ে লজ্জার বিষয় আর কী হতে পারে? যে দেশের নেতানেত্রীরা তাদের নিজেদের হাতে গড়া চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আস্থা রাখেন না, বিদেশে তাদের চিকিৎসা গ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞার দাবি তোলা কি অযৌক্তিক হবে?

করোনার প্রাদুর্ভাব আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার অন্তঃসারশূন্য চিত্র সামনে তুলে ধরেছে। দেশে এখন অসুস্থ হলে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য কোনো ভিআইপির খোঁজ করতে হয়, না হলে ভয় হয় যে হাসপাতালে জায়গা মিলবে না, ঠিকমতো চিকিৎসা হবে না। এটা কোনো চিকিৎসাব্যবস্থা হতে পারে? অসুস্থ হলে সুচিকিৎসা তো দূরের কথা একটা সম্মানজনক মৃত্যু যেখানে নিশ্চিত করা যায় না, তখন সেটাকে কোনো চিকিৎসাব্যবস্থা বলে না।

অথচ আমাদের কর্তাব্যক্তিরা প্রায়ই বলেন, বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হয়েছে। কিন্তু উন্নয়ন মানে শুধু মাথাপিছু আয় কিংবা প্রবৃদ্ধির অগ্রগতি নয়, উন্নয়ন মানে হলো সামগ্রিক জীবন-মানের উন্নয়ন। সেখানে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। নবজাতকের মৃত্যুরোধ, শিশু মৃত্যুহার হ্রাস, মাতৃমৃত্যু কমিয়ে আনা, টিকাদান কর্মসূচি শতভাগ সাফল্যের ব্যাপারে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিস্ময়কর। এসব বিষয়ে কারও কোনো দ্বিমত নেই। এসব অগ্রগতির সবই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে। কিন্তু উন্নত বা বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবায় আমরা এখনো তেমন কোনো অগ্রগতি অর্জন করতে পারিনি।

সারা বিশ্বে স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটা স্বাভাবিক চিত্র হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা যখন ভালো হয়, তখন বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার ঝুঁকি বাড়ে। গড় আয়ু বাড়লে বার্ধক্যজনিত রোগ বাড়বে। অপুষ্টিজনিত রোগ কমলে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যানসার, স্থূলতার মতো সমস্যাগুলোর ঝুঁকি বাড়বে। আমাদের যেভাবে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার দিকে নজর দেওয়ার দরকার ছিল, সেভাবে নজর দেওয়া হয়নি। বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশ এখনো আন্তর্জাতিক মানের ধারে-কাছেও পৌঁছাতে পারেনি।

যদিও বাংলাদেশ হৃদরোগ, ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সেটা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও বিত্তবানদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। তারা এ ধরনের চিকিৎসার জন্য বিদেশেই যায়। বাংলাদেশের মানুষ বিদেশে চিকিৎসার জন্য কত টাকা ব্যয় করে, সেটাও একটা গবেষণার বিষয়। আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে, বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। সে লক্ষ্যে যদি উন্নত দেশ হিসেবে নিজেদের দাঁড় করাতে চাই, তাহলে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানোর দিকে মনোযোগী হতে হবে। বিশেষ করে ক্যানসার, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপের মতো বিষয়গুলোর জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন চিকিৎসাব্যবস্থা বাংলাদেশে চালু করতে হবে।

কিন্তু বাস্তবতা বলছে, বাংলাদেশ এই বিষয়গুলোতে কাক্সিক্ষত মান থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। উন্নয়ন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। কাজেই সামগ্রিক উন্নয়নের মাইলফলক স্পর্শ করতে হলে এখনই বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার দিকে নজর দিতে হবে এবং ন্যূনতম মান অর্জন করতে হবে। প্রশ্ন হলো, কাজটা করবে কে? যারা এটা করবেন, তারা তো কিছু হলেই বিমানে উঠে বসেন। কাজেই আমাদের সব দাবি-প্রত্যাশা-আকাক্সক্ষার মিনার কেবল অনন্ত জিজ্ঞাসার চিহ্ন হয়ে আছে, হয়তো থাকবেও!

লেখক ও কলামনিস্ট ([email protected])


mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ