৪ হাজার কোটি টাকা যদি মামুলি হয়, তবে ২০ কোটি টাকা হাতের ময়লা

৭৪৯
এসএম

করোনাকালেও দুর্নীতি থেমে নেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতেও। চিকিৎসাসেবার মান শূন্যের কোটায়। মন্ত্রী, এমপি, সচিবসহ দেশের ভিআইপিরাই সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছে না। সাধারণ মানুষ তো হিসেবেই নেই।মহামারি ভাইরাসের করাল থাবায় যখন মানুষের সুরক্ষার জন্য গ্লাভস, মাস্ক খুবই প্রয়োজনীয় জিনিস সেখানেও এই সময়ে দুর্নীতি বাদ যায় নি।

দেশের সেরা হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসক নার্সদের একমাসের নাস্তার বিল দেখানো হয়েছে ২০ কোটি টাকা। অথচ নাস্তার মেন্যুতে মাত্র ১ পিস পাউরুটি, একটি কলা ও ১টি ডিম । এই হাসপাতালের সামনে চিকিৎসা না পেয়ে মৃত ব্যক্তির স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। আর বেসরকারি হাসপাতাল তো কোন রোগীই ভর্তি নেয় না।

আমার পরিচিত একজন গত রাতে মারা গেলেন। বাসায় স্বাসকষ্ট দেখা দিলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও কুমিল্লার পাঁচ হাসপাতাল ঘুরেও ভর্তির সুযোগ পাননি রোগীর স্বজনরা। বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন সেই রোগী রাতেই। রেখে গেলেন অসহায় স্ত্রী এবং এতিম হলো দুটো বাচ্চা। কোথায় যাবে মানুষ?

এমনকি বাংলাদেশে এ পর্যন্ত শতাধিক প্রথম সারির চিকিৎসক মারা গেলেন বিনা চিকিসৎসায়। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর নিজের হাসপাতালেই চিকিৎসা পাননি তারা। যে হাসপাতালে হাজার হাজার রোগীর চিকিৎসা করেছেন যারা সেই হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা না পেয়ে মারা গেলেন তারা।

তাহলে সাধারন মানুষের কি অবস্থা! তাদের তো বেঁচে থাকাটাই যেন এখন অপরাধ। শুধু হাসপাতালে ভর্তি নয়, বড় সমস্যা এখন হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জামাদি। এমনকি সরকারের নেই মনিটরিং ব্যবস্থা। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাই দুর্নীতিতে ব্যস্ত। করোনার মতো ভয়াবহ ব্যাধির মধ্যেও সংশোধন হচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। চিকিৎসাসেবা তো দূরের কথা, এখন করোনা সনাক্তের কি টনিয়েও চলছে চরম দুর্নীতি। অনেক জেলায় কিট সরবরাহ নেই। এত অনিয়ম আর দুর্নীতির কারণে ভাইরাসে জর্জরিত আজ অসহায় বাংলাদেশ। শাসকই যদি শোষক হয় তাহলে বিচারের ভার কার হাতে?

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ২০০ চিকিৎসক নার্সের এক মাসের নাস্তার বিল ২০ কোটি টাকা নিয়ে তোলপাড় সোশ্যাল মিডিয়া। আমার এক বাল্য বন্ধু ঢাকা মেডিকেল কলেজের সার্জন। তিনি বললেন, নাস্তার মেন্যুতে মাত্র ১পিস পাউরুটি, একটি ডিম, ১টি কলা, ১টি মিষ্টি সাথে এক টুকরা টিস্যু। ২০ কোটি টাকা হিসেবে একদিনে প্রতিজনের নাস্তার বিল নাকি ১০ হাজার টাকা।

যাতে এক পিস পাউরুটির দাম পড়েছে ৭০০০ টাকা, কলার দাম ২০০০ টাকা, একটি ডিমের দাম পড়েছে ১০০০ টাকা, ওয়ান টাইম প্লেটের মূল্য ১০০০টাকা আর টিস্যুর দাম পড়েছে ১১১টাকা।

এর আগে সবুজ বনায়নের জন্য একটি কলা গাছের বিল দেয়া হয়েছিল ৬ লাখ টাকা। জীবন মৃত্যুর এই সময়েও বন্ধ হচ্ছে না দুর্নীতির নামে প্রকাশ্যে ডাকাতি। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই হতবাক। এই প্রথম দেখলাম সংসদে বিরোধী দলের সমালোচনার সাথে এক মত পোষন করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রায় এক যুগ আগে কুমিল্লা থেকে সিলেট যাচ্ছিলাম ট্রেনে চড়ে। ক্যান্টিনে বসে একজন ট্রেন পরিচালক(গার্ড) সাথে চা খেতে খেতে কথা বলছিলাম। টিকেট কালোবাজারি, তেল চুরি এসব নিয়ে কথা বলছিলাম। আক্ষেপের সুরে তিনি একটি অভিজ্ঞতার কথা বললেন। একদিন চলন্ত অবস্থায় ট্রেনের বিদ্যুৎ চলে যায়। জেনারেটর কাজ করছে না। ট্রেনে দায়িত্বরত টেকনিশিয়ান পার্শ্ববর্তী বাজার থেকে একটি পার্স এনে জেনারেটর চালু করলেন। যার দাম ছিল মাত্র ২৫০০ টাকা। তিনি এর ভাউচার এনেছিলেন ৫০০০ টাকার।

কিন্তু এক বছর পর ওই ভাউচারটি ফেরত দেয় অডি টকমিটি। ডাক পড়ে সেই টেকনিশিয়ানের। সদ্য চাকরিতে যোগ দেয়া টেকনিশিয়ান তো ভয়ে কাতর। তিনি স্বীকার করলেন দ্বিগুন দামের ভাউচার এনেছিলেন। কিন্তু অডিট কর্মকর্তা তাকে ধমকদিলেন। ভাবছেন দ্বিগুন দামের জন্য? না...ভূল। এই মেশিনারি পার্সটির অতীতের দাম ধরা হয়েছিল ৪৫ হাজার টাকা। এখন ৫০০০ টাকার ভাউচার দেখানো হলে আগের সব টাকা ফেরত দিতে হবে তাই। গল্পটিআজও মনে রেখেছি। তার মানে দুর্নীতি এখন থেকে চলছে না।

বংশ পরম্পরায় হয়ে আসছে। আমার বাবা, তার বাবা, তার বাবা, তার বাবা...এভাবেই চলমান।যে দেশে টাকা দিয়ে সাংসদ হয় আদমপাচারকারি স্বামী-স্ত্রী দম্পতি। মাসে আড়াই কোটি টাকা হোটেল বিল পরিশোধ করে পাপিয়ারা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টের ৪ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়। আর সেইসময়কার অর্থমন্ত্রী বললেন এটা মামুলি ব্যাপার।

৪ হাজার কোটি টাকা মামুলি হলে, ২০ কোটি টাকা নাস্তার বিল তো হাতের ময়লা মাত্র। দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার রেকর্ডও আছে বাংলাদেশের। আর এসবের পরও দুর্নীতিবাজরা পায় পদন্নোতি।এ যাবৎকালে শুনিনি কখনো দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী এমপি বা আমলাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হতে। আমার জানাশোনা দুইজন কোটিপতি আছেন। তাদের একজন সাব রেজিস্ট্রি অফিসের নকল নবীশ অপরজন মাষ্টার রোলে বিদ্যুতের মিটার রিডার। এদের বিচার বা শাস্তি হয়না।

শাস্তি হয় তাদের, যারা দুর্নীতি নিয়ে লিখেন বা কথা বলেন। কোভিড-১৯ এ সারাদেশের ৫০ হাজার হতদরিদ্র মানুষের মাঝে ২৫০০ টাকা করে দেয়ার ঘোষনা দেন প্রধানমন্ত্রী। আমার জানাশোনা শত শত হতদরিদ্রের কেউ ওই টাকা পেয়েছে কিনা জানা নেই। বাকীটা ইতিহাস...

জ্ঞান হওয়া থেকে দেখে এসেছি যে, বাংলাদেশের মতো দেশে ধনী হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো আয়ের উৎস থাকেনা। কালো টাকা সাদা করার শেষ সুযোগ এবারের বাজেটেও। এই বছরের বাজেটে সেই একই বাণী, একই রীতি।শেষ সুযোগ কবে শেষ হবে? কেউ জানেনা।এইভাবে চলবে...

লেখকঃ সাংবাদিক, নিউইয়র্ক(যুক্তরাষ্ট্র)।


mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ