এখন সরকারকে অস্থির করা নয়, পাশে থাকার সময়

অনলাইন ডেস্ক
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
০৭ মে ২০২০, ০৭:৩৭ পূর্বাহ্ণ
৩৭৮
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী

আগে দেশের ৯৫ শতাংশ শ্রমিকই ছিল কৃষি খাতের। তাই মন্দা দেখা দিলে বা দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে সরকার গ্রামে কাজ সৃষ্টি করে টাকা ব্যয় করার পরিকল্পনা নিতো যেন মানুষ কাজ করে আয় করতে পারে। ১৯৫৬ সালে যখন দেশে মন্দা অবস্থা বিরাজ করছিল তখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী দেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি গ্রামে গ্রামে স্টেট রিলিফের কাজ করার কর্মসূচি নিয়েছিলেন। তখন দেখেছি আমাদের এলাকায় এই স্কিমের অধীনে হাজার হাজার কৃষিশ্রমিক মাটি কেটে সুদীর্ঘ বাইশ মাইল হালদা নদীতে বাঁধ তৈরি করেছিল। এখন কৃষিতে এত শ্রমিক লাগে না। বিভিন্ন উন্নয়নের কারণে শ্রমিকরা শিল্প-কারখানা বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানমুখী হয়ে গেছে। সুতরাং এখন কোনও দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হলে খাতওয়ারি প্রণোদনা প্রকল্পে টাকা দিতে হয়।

প্রধানমন্ত্রী গত কয়েকদিন আগে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্রকল্পে টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছেন। এই এক লাখ কোটি টাকা তিন বছরব্যাপী প্রকল্পগুলোতে ব্যয় করা হবে। আর করোনাভাইরাসের কারণে অর্থ প্রবাহে যে স্থবিরতা সৃষ্টি হতে যাচ্ছে তা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। এই অর্থের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক জোগান দেবে ৭৩ হাজার কোটি টাকা, আর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দেবে ২৫ হাজার কোটি টাকা। এই ৯৮ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের ব্যাপারে মতভিন্নতা রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন নতুন টাকা ছাপাতে। আবার এটার বিরোধী পক্ষেও মত রয়েছে। কোনও দেশ অপারগতার শেষ অস্ত্র হিসেবে টাকা ছাপানোর কথা চিন্তা করে। আর আমাদের কোনও কোনও বিশেষজ্ঞ শেষ অস্ত্রটাকে অন্য প্রচেষ্টা না চালিয়ে প্রথমে ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছেন।

আমি আমার গত এক লেখায় টাকা ছাপানোর বিরোধিতা করেছি। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি আর জাপান বিপর্যয় ঠেকাতে গিয়ে নতুন টাকা ছাপিয়ে ছিল। তাতে তাদের অর্থনীতির কাঠামো আরও বিধ্বস্ত হয়েছিল। টাকার ব্যবস্থা করার জন্য আমরা আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো স্থগিত করতে পারি। পদ্মা সেতু ছাড়া অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প স্থগিত করলে এবং ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, আইএমএফ থেকে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করলে মনে হয় এ টাকা ব্যবস্থা করা কঠিন হবে না।

জরুরি ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত প্রণোদনা প্রকল্পগুলোর কাজ আরম্ভ করা দরকার। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ঋণ দেওয়া নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কোনও বাণিজ্যিক ব্যাংক নয়। সুতরাং তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোনও লেনদেন নেই। তারা কাউকে চেনে না। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গে সেই ব্যবধানটা নেই। সে কারণে ঋণ তাদেরকেই দিতে হবে।

যেহেতু ঋণ তারা দেবে, সেহেতু ঋণ আদায় করার দায়িত্বটাও তাদেরকেই নিতে হবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যদি কোনোভাবে প্রভাবিত হওয়া ছাড়া প্রকৃত লোকগুলো চিহ্নিত করে ঋণ প্রদান করে থাকে, তাহলে ঋণ আদায় না হওয়ার কিছু নেই। সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক—সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী ঋণ খেলাপি হওয়ার পেছনে তো ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে। এই ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে ব্রাঞ্চ কর্মকর্তা থেকে আরম্ভ করে ওপরে চেয়ারম্যান পর্যন্ত ঋণের অঙ্ক অনুসারে সালামি দিতে হয়। সম্পর্কটা তো এখানেই পলুটেড হয়ে আছে।

যাহোক প্রণোদনা প্রকল্পের ঋণ নিয়ে বেশি গড়িমসি করা ঠিক হবে না। প্রকল্পগুলো যত শিগগির সম্ভব আরম্ভ করা প্রয়োজন। এই ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী জটিলতা পরিহারের জন্য একটি কমিটি গঠন করে দিতে পারেন, যেন বিষয়টি প্রলম্বিত না হয়। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দায় দায়িত্ব এড়িয়ে কীভাবে ব্যাংকিং করতে চায়! ব্যাংকিং ব্যবসায় দায়িত্ব এড়ানোর কোনও সুযোগ নেই। ব্যাংক যাকে ঋণ দিচ্ছে তার সম্পর্কে যদি সজাগ, সতর্ক হয়, তবে খেলাপি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই সীমিত।

প্রকল্পের মধ্যে পোশাকশিল্পের প্রণোদনা এবং কৃষি খাতে প্রণোদনা সফল করার জন্য সরকারকে শতভাগ প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আমরা আশা করি যে সরকার কঠোরভাবে চেষ্টা চালালে এবং এই দুই প্রকল্পের বাস্তবায়ন করার প্রাণপণ চেষ্টা চালালে আশু অর্থনৈতিক মহামন্দা এবং দুর্ভিক্ষ থেকে দেশের রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।

খুবই আশাপ্রদ ব্যাপার হলো বোরোর ফলন ভালো হয়েছে এবং মানে মানে হাওরের ফসল কাটা প্রায় শেষ। চাষাবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন দেশের মানুষের আট মাসের খাদ্যের ব্যবস্থা বোরো ফসল থেকে হবে। জুন থেকে আমনের চাষ। যদি কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয় না হয় তবে আমন থেকেও অনুরূপ ফলন আশা করা যায়।

অনেকে লকডাউনকে শিথিল করার জন্য গার্মেন্টস খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অসন্তুষ্ট হয়েছেন, কিন্তু ৫৬ হাজার বর্গমাইলে ১৭ কোটি মানুষের বসবাস। এই মানুষগুলোকে অনাহার থেকে বাঁচাতে হলে, অর্থ প্রবাহ আর পণ্য প্রবাহ সৃষ্টি করতে না পারলে দেশ তো বিশৃঙ্খলায় ডুবে যাবে। লুটপাট আরম্ভ হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন দেশের প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘদিন দেখতে দেখতে তার প্রতি কিছু মানুষের মোহ দুর্বল হয়েছে। আবার কিছু সজাগ মানুষের তার নেতৃত্বের প্রতি দৃঢ় আস্থা সৃষ্টি হয়েছে। কিছু লোক তার বিরুদ্ধে কলামে, সোশ্যাল মিডিয়ায় বিরূপ কথাবার্তা লিখছেন। খবরে দেখলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে করোনাভাইরাস নিয়ে এবং সরকারের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে একজন কার্টুনিস্ট এবং একজন লেখককে গ্রেফতার করা হয়েছে। মোট ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর আগে ধানকাটা নিয়ে স্ট্যাটাস দেওয়ার জন্য একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সত্যতা জানি না, রাষ্ট্রচিন্তা নামক সংগঠনের একজনকেও নাকি সরকারবিরোধী প্রচারণার জন্য ধরে নিয়ে গেছে সাদা পোশাকপরা লোকেরা। অন্যদিকে একজন সাংবাদিককে বহুদিন পর উদ্ধার করা হয়েছে, কিন্তু তার হাত পেছনে মোড়ানো হাতকড়া পরিয়ে আবার জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আমি সবটার বিরোধিতা করি। এই সময়ে গড়ে ধরাধরি খুব জরুরি নয়, প্রয়োজনে নিজস্ব চ্যানেলে ডেকে নিয়ে সতর্ক করুন, বুঝান। তাতে কাজ না হলে ব্যবস্থা নিন। আবার করোনাকে পুঁজি করে যারা সরকারকে বিপদে ফেলার জন্য এই নাজুক সময়ে আদাজল খেয়ে অপপ্রচারে নেমেছে, তাদের কাজটি মোটেও ঠিক হচ্ছে না। সেটাও দমনের দরকার আছে। দেশে জরুরি মুহূর্তে মানবাধিকার অকেজো হয়ে পড়ে।

কলামিস্ট বন্ধুদেরসহ সবার প্রতি অনুরোধ, এখন রাজনীতি করার সময় নয়। দুর্যোগ চলে গেলে পরে না হয় মন খুলে রাজনীতি করতে পারবেন। এখন জাতীয় ঐক্য সুসংহত করার সময়। আর যারা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে লিখছেন, অপপ্রচার করছেন, তাদের প্রতি একটা প্রশ্ন রেখে যেতে চাই—বর্তমানের কঠিন সময়টিতে দেশে শেখ হাসিনার বিকল্প কে? দীর্ঘ ১৬ বছর শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী। তিনি এমন কী কাজ করেছেন যে দেশের স্বার্থ বিপর্যস্ত হয়েছে?

ব্রিটেনের ইকোনমিস্ট পত্রিকা এই সপ্তাহে এক প্রতিবেদনে বিভিন্ন সূচক পর্যালোচনা করে দেখিয়েছে—মহামারি পরিস্থিতিতে চীন, ভারত, আরব আমিরাতের মতো দেশকে পেছনে ফেলে তুলনামূলকভাবে নিরাপদে রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। এরপরও যদি সন্তুষ্ট না হন, তবে অনুরোধ করবো দুর্যোগে মানুষের মন অস্থির থাকে। অস্থির মন উস্কানি পেলে নেচে ওঠে। এখন সত্য মিথ্যা মিশিয়ে মানুষকে অস্থির করা ঠিক হবে না—জ্ঞানপাপী ছাড়া সবাই নিশ্চয় কথা বোঝেন।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

এসএম/আওয়াজবিডি


mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ