করোনাকালের গল্প: তাসলিমা ও পীর ওষুধবাগী

অনলাইন ডেস্ক
মুহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম
০৫ মে ২০২০, ০৯:১৭ পূর্বাহ্ণ
৫২৩
মুহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম

কেবলা বাবা, আমার মেয়ে তাসলিমার তো করোনা অইছে।

তোমার মাইয়্যার করোনা অইছে, আমি কী করতাম?
আপনি কী ওষুধবাগী পীর কেবলা বলতেছেন না?
না, আমি তার ছেলে পীরজাদা গাবগাছি বলতেছিলাম।

ও আচ্ছা, আমাদের ছোডো পীর কেবলা বাবা বলতেছিলেন?

জ্বি বলতেছিলাম।

বাবা কেবলা, আপনি জানেন কীনা জানি না। গত বছর আমার আদরের পোলাডা মইরা গেছে। গঞ্জের হাসপাতালে লইয়া গেছিলাম। টেহার অভাবে চিকিৎসা করাইতে পারি নাই। মরা লাশটা লইয়া যহন গাঙ্গের পাড় দিয়া কাইন্দা কাইন্দা আইতেছিলাম, তখন আপনার বাবার খাস মুরিদ কাশেমের লগে দেহা। কাশেম আমার ছোডবেলার বন্ধু।

কোন কাশেম? চরপাড়ার কাশেম চাচা?
জ্বি বাবা। আমগো চরের কাশেম।

কাশেম কইল, জলিল মিঁয়া তোমারে তো আগেই কইছিলাম, পোলাডারে গঞ্জে লইয়া লাভ অইব না। ওষুধবাগী পীর বাবার কাছে লইয়া যাও। বাবা পানি পড়া দিলে সব রোগ বালা অইয়া যায়। হুনো নাই? শিমুল গেরামের কাউছারের কথা। ক্যান্সার অইছিল। বাবার পানি পড়া খাইয়্যা বালা অইয়্যা গেছিল। পরে বাবার ফরমান অনুযায়ী চলে নাই। তাই দশদিনের মাথায় মইরা গেছে।

কাশেমের কথা যে একদম হুনি নাই, তা না। দুইডা গাভীন গাই ছিল। একটা বেইচ্যা আপনার বাবার কাছে আইবার চাইছিলাম। কিন্তু, মসজিদের ইমাম সাহেব কইল, আমগো ধর্মে নাকি পীরটির বইলা কিচ্ছু নাই। তাই আর আপনার বাবা কেবলার কাছে আইলাম না। হেই টেহা লইয়া গঞ্জে গেছিলাম। কিন্ত..

এটি বলেই জলিল মিঁয়া চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। সে দিন চরে প্রচুর ঝড় হয়েছিল। জলিল মিঁয়ার ছনে ছাওয়া ঘরের চাল ঝড়ে উড়ে গেছে। করোনার কারণে আজ এক মাস যাবৎ জলিল মিঁয়া ঠিকমত আয় করতে পারছে না। ঘরে ভাতের অভাব। দুর্গম চরে তেমন কেউ ত্রাণ নিয়া আসে নি। কেবল উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাসফাকুর রহমান কিছু ত্রাণ নিয়ে এসেছিল। মানবিক অফিসার হিসেবে মাসফাকুর রহমানের উপজেল্যাব্যাপী একটি সুনাম আছে। জলিল মিয়ার প্রকৃত বাড়ী ছিল মানিকগঞ্জে। পদ্মার ভাঙনে একরাতেই জলিল মিয়া নিঃস্ব ও ভূমিহীন হয়ে সিরাজগঞ্জের যমুনার চরে আশ্রয় নিয়েছে।

গত বছর জন্ডিশে তার ছেলে মারা গেছে। তাসলিমা ব্যতীত জলিল মিঁয়ার এখন আর কোনো সন্তান নেই। তাসলিমা মেধাবী। দেখতেও সুন্দরী। জলিল মিঁয়ার ভাষায় তার মেয়ের গায়ের রঙ হল কাঁচা রোদের ন্যায়। ছেলেটিকে ঘিরে জলিল মিাঁয়ার তেমন স্বপ্ন না থাকলেও মেয়েটিকে নিয়ে জলিল মিঁয়ার অনেক স্বপ্ন ছিল। স্কুলের মাস্টার আরিফ যখন তাসলিমার প্রশংসা করত, জলিল মিঁয়ার তখন এক অপার্থিব সুন্দর আনন্দের অনুভূতি হইত। জীবনে কেউ জলিল মিঁয়ার প্রশংসা করে নি। বুদ্ধির অভাবের কারণে বারবার সে প্রতারিত ও বঞ্চিত হয়েছে। প্রকৃতিও তার উপর করুণা করে নি। তাই কেউ তার মেয়ের প্রশংসা করলে তার শূন্য হৃদয়টা কেমন যেন বর্ষার নদীর মত ভরে যায়। শত অভাবের মধ্যেও সে তাসলিমাকে লেখাপড়া করাচ্ছিল।

তাসলিমা গত বছর অষ্টম শ্রেণীতে জিপিএ ৪.৬ পেয়েছে। কিন্তু গত বছর তার জোয়ান ভাই মারা যাওয়ার কারণে তার বাবার মন ভাঙ্গার সাথে সাথে শরীরটাও ভেঙ্গে গেছে। একদিন কাজে গেলে দুদিন কাজে যেতে পারত না। অভাবের সংসারে আরো অভাব নেমে আসে। বাধ্য হয়েই তাসলিমা লেখাপড়া বন্ধ করে গাজীপুরের শামস গার্মেন্টসে চাকরি নেয়।
এবারের করোনায় গার্মেন্টস বন্ধ হলে তাসলিমা বাড়ী চলে যায়। কিন্তু হঠাৎ তার বান্ধবী জাহানা ফোন করে বলে তারাতারি কাজে জয়েন না করলে বেতন হবে না। জাহানার ফোন পেয়ে তাসলিমা অনেক কষ্ট করে গাজীপুরে এসে কাজে যোগ দেয়। তিন দিন না যেতেই তাসলিমার কেমন যেন জ্বর জ্বর লাগে। ধীরে ধীরে জ্বর বাড়তে থাকে। সাথে শুকনো কাশিও শুরু হয়।

তাসলিমার এ অবস্থা দেখে তার বান্ধবী জাহানা বলে, তোর মনে অয় করোনা অয়ছে। জাহানার কথা শুনে তাসলিমা কেমন যেন কবরের মত নিস্তব্ধ হয়ে যায়। মূহুর্তেই পুরো পৃথিবী তার কাছে ঘন অন্ধকার মনে হয়। কিছুক্ষণ পর বুক ফুঁড়ে তার একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস বের হয়। নিজেকে প্রবোধ দিয়ে বলে, আরে না। আমার করোনা অই নাই। একটু জ্বর অইছে। নাপা খাইতেছি। ভালা অইয়া যাইব।

জাহানা তাসলিমার বিষয়টি সাহস করে প্রডাকশন ম্যানেজারকে কে জানায়। প্রডাকশন ম্যানেজার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, ওকে, তাসলিমাকে বল, বাড়ী চলে যেতে।

জাহানা বলে, স্যার তাসলিমার কাছে তো বাড়ী যাওয়ার টাকা নাই। এখনো তো গত মাসের বেতন পাই নাই। কেমনে যাইব। কেমনে যাইব সেটা আমি কেমনে কমু। ওরে বলবা সে যেন আর কাজে না আসে। এটি বলেই প্রডাকশন ম্যানেজার ফোন রেখে দেয়।

জাহানার দিকে ফেল ফেল করে তাকিয়ে থাকে তাসলিমা। ছোট্ট একটি গিঞ্জি ঘরে দুজন কিশোরী মেয়ে এক অপরের দিকে অসহায় হয়ে তাকিয়ে থাকে। তাসলিমার এ অসহায়ত্ব জাহানার মায়া লাগে। জাহানা তার জমানো পাঁচশত টাকা তাসলিমাকে দিয়ে বলে, বইন তুই কাল বাড়ী চইলা যা। এইহানে তর কেউ নাই। আমি কাজে চইলা গেলে তরে কেডা দেখব?

প্রচণ্ড জ্বরে তাসলিমা রাতে ঘুমাতে পারি নি। জাহানা সারারাত জেগে তাসলিমার সেবা করেছে। পরদিন সকালে সে এই ভঙ্গুর শরীর নিয়েই বাড়ীর পথে রওনা দেয়। টার্মিনালে বাস নেই। অনেক কষ্টে ভেঙ্গে ভেঙ্গে সে সন্ধ্যার দিকে বাড়ীতে পৌঁছায়। দূর থেকে তাসলিমাকে দেখে তার বাবা-মা আনন্দিত হলেও কাছে আসলে সে আনন্দ বিষাদে রূপ নেয়। তাসলিমার শরীর থেকে যেন আগুন বের হচ্ছিল। একেকটা কাশি যেন মেয়েটির শ্বাস বন্ধ করে দিচ্ছিল। তাসলিমার এ ভঙ্গুরতা ও যন্ত্রণা দেখে তার বাবা মা চিৎকার শুরু করে। চিৎকার শুনে প্রথমে পড়শীরা এলেও জ্বরের কথা শুনে সবাই দ্রুত সটকে পরে।

জলিল মিঁয়া কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করে, মারে তোমার কী অইছে?

তাসলিমা কাশতে কাশতে বলে, আমার নাকি করোনা অইছে। একমাত্র আদরের মেয়েটির করোনার কথা শুনে জলিল মিঁয়ার বুকফাঁটা চিৎকারে চারদিকের পরিবেশ ভারী হয়ে যায়। সে তাড়াতাড়ি মোবাইলটা নিয়ে ওষুধবাগী পীর বাবাকে ফোন দেয়। জলিল মিঁয়ার বুকফাঁটা চিৎকার পীরজাদা গাবগাছির পাষণ্ড হৃদয়কে নূন্যতম স্পর্ষও করতে পারে না।
গাবগাছি অস্থির ও বিরক্ত হয়ে বলে, আরে মিঁয়া কাঁদতেছ কেন? কী কইবা তাড়াতাড়ি কইয়্যা ফেল।
বাবা, পোলাডা মরার পর আরেকটা গাভীন গাই বেইচ্যা আপনার বাবারে ৩০ হাজার টাকা হাদিয়া দিছিলাম। যাতে আমার মাইয়্যার রোগ অইলে আপনার বাবা পানি পড়া ও দোয়া দিয়া বালা কইরা দেয়।

ছোড বাবা, আমার মাইয়্যার নাকি করোনা অয়ছে। মেয়েটা শ্বাস নিতে পারতাছে না। বড় বাবারে কন একটু দোয়া করতে, আমি অহনেই পানি লইয়্যা পানি পড়ার লাইগ্যা আইতেছি।

জলিল মিঁয়ার কথা শুনে গাবগাছি প্রচণ্ড ধমক দিয়ে বলল, ঐ মিঁয়া তুমি হুন নাই? আমার আব্বাজান কেবলা যে গত সপ্তাহে করোনায় মারা গেছেন।
গাবগাছির কথা শুনে জলিল মিঁয়ার পুরো শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আস্তে করে মোবাইলটা হাত থেকে পড়ে গেল। ঐ সময়ই তাসলিমার মা চিৎকার দিয়ে বলল, কইগো তাসলিমার বাপ!!

দেহেন আমগো তাসলিমা শ্বাস নিতে পারতেছে না। জলিল মিঁয়া তাসলিমার কাছে যেতেই তাসলিমার পুরো শরীরটি ঠাণ্ডা হয়ে নিথর হয়ে গেল। তাসলিমার আর শ্বাস নেওয়ার দরকার হল না।

লেখক:শিক্ষক, লোক প্রশাসন বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।


mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ