অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যারকে নিয়ে স্মৃতিকথা

ড. জেবউননেছা

সময়টা ২০০৮ সন। ‘মুক্তিযুদ্ধ বুদ্ধিজীবীর দৃষ্টিকোণ ও অভিজ্ঞতা’ নামক একটি গ্রন্থ সম্পাদনা করার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন বুদ্ধিজীবীবৃন্দ তাঁদের জীবনের ১৯৭১ এর স্মৃতিকথাসহ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটি উৎসর্গ করি শ্রদ্ধাভাজন সরাসারি শিক্ষক লোকপ্রশাসন বিভাগের দিকপাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোহাব্বত খান স্যারকে। গ্রন্থের লেখা সংগ্রহের ব্যাপারে মোহাব্বত খান স্যার আমাকে পরামর্শ প্রদান করেন অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যারের সাথে দেখা করতে এবং স্যারের মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত লেখা সংগ্রহ করতে। মোহাব্বত খান স্যারের সাথে জামিল স্যারের দীর্ঘ ৫০ বছরের সম্পর্ক। এলিফ্যান্ট রোডে দু’জন স্যার ৪০ বছর পাশাপশি বাস করেছেন। যাই হোক মোহাব্বত খান স্যার জামিল স্যারকে ফোন করেন এবং আমার সাথে জামিল স্যারের যোগসূত্র করিয়ে দেন।

স্যারের ফোন করার পর পর যোগাযোগ করি জামিল স্যারের সাথে। এলিফ্যান্ট রোডে স্যারের বাসায় গেলাম। এমন একজন গন্যমান্য ব্যক্তি, অথচ স্যারকে দেখে বোঝাই যাচ্ছিলো না। আসলে ‘ফলবান বৃক্ষ নত হয়’ সেদিন এই প্রবাদটি নতুন করে প্রমাণিত হয়েছিল। বিশাল উঠোন তার মধ্যে স্যারের বাড়ি। ভীষণ সুন্দর স্যারের বাসাটা। স্যারের স্ত্রী ও সজ্জন মানুষ। স্যার আমাকে অনেকক্ষণ সময় দিলেন। স্যারের কাছ থেকে শুনলাম মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। পরবর্তীতে, স্যারের স্মৃতি আমার গ্রন্থে লিখলেন। এরপরে লেখার উদ্দেশ্যে বেশ কয়েকবার স্যারের বাসায় গিয়েছি।

স্যারের সাথে সাক্ষাৎকার গ্রহণের অনেক ছবি আমার কাছে সংরক্ষিত ছিল। ল্যাপটপের হার্ডডিস্ক নষ্ট হয়ে যাবার ফলে স্যারের সাথে তোলা ছবিগুলো হারিয়ে যায়। এরপর মাঝে মাঝেই স্যারের সাথে দেখা হয়েছে, কুশল বিনিময় হয়েছে। স্যার যখন জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেন ২০১৮ সালের ২৮ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে ঢাবি শিক্ষক সমিতি এবং ঢাবি অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে তিনজন জাতীয় অধ্যাপকের সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছিল। যথাক্রমে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান স্যার, অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম স্যার এবং অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যার তিনজনই উপস্থিত ছিলেন। এই তিন জন বিশিষ্ট ব্যক্তির স্নেহ সান্নিধ্য আমি পেয়েছি এবং তিনজনই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা আমার সম্পাদিত গ্রন্থে লিখেছেন। আমি এজন্য নিজেকে ভীষণ সৌভাগ্যবান মনে করি।

সেখানে স্যার বক্তব্য রাখলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে ও যে স্যারের সম্পর্ক আছে সেটি সুন্দরভাবে বললেন। কারণ স্যারের স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। সেই কথাটিই হাসতে হাসতে বলেন বক্তব্যে। সেদিনের অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই হিসেবে উপস্থিত হবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার।

জামিলুর রেজা স্যার একজন প্রতিতযশা প্রকৌশলী, দেশের সম্পদ। এই মানুষটির মনের মাঝেও দেশের স্বাধীন পতাকার জন্য যে হাহাকার ছিল তা আমি স্যারের সাথে সাক্ষাৎ না হলে জানতামই না। একজন অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর মনে একটি সবুজ শ্যামল বাংলাদেশ বাস করতো। স্যারের স্মৃতিকথায় তা বুঝতে বাকী ছিল না আমার। আমি সেদিন থেকে স্যারের ভক্ত হয়ে যাই। শৈশব থেকেই আমি জ্ঞানীগুণীদের সংস্পর্শ পেয়েছি। তারই ধারাবাহিকতায় জামিল স্যার লিখেছেন আমার সম্পাদিত গ্রন্থে এটা আমার জন্য বিশেষ প্রাপ্তি। মাঝে মাঝে ভীষণ মন খারাপ হয় ধীরে ধীরে বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ চলে যাচ্ছেন আমাদের ছেড়ে। স্যার চলে যাবার সংবাদটি আমার মানতে কষ্ট হচ্ছে। সকাল থেকেই স্যারের লেখা স্মৃতিকথাটি অনেকবার পড়ে ফেলেছি।

কি করবো এই এতটুকু তো স্মৃতি সঞ্চয় করা আছে স্যারের সাথে আমার। আজ এই লেখায় স্মরণ করি আমার গ্রন্থে যারা লিখেছেন তাদের মধ্যে যারা ইতিমধ্যে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী,ভাষা সৈনিক অধ্যাপক ড. হালিমা খাতুন, ভাষাসৈনিক রওশন আরা বাচ্চু, বাংলাদেশ বেতারের সহকারী আঞ্চলিক পরিচালক, চিত্র পরিচালক এবং মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিন রুমি এবং বাংলাদেশ লেখিকা সংঘের উপদেষ্টা বিশিষ্ট লেখিকা নয়ন রহমান। যাদের স্নেহে আমি সিক্ত হয়েছি। এসকল গুণী ব্যক্তিরা চলে গিয়েছেন, কিন্ত রেখে গিয়েছেন তাদের কর্ম। একদিন আমিও চলে যাব। এটাই নিয়ম কিন্তু জামিল স্যারদের মতো মানুষ চলে যাওয়া মানে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি।

আজ এই করোনাভাইরাসের লকডাউনে বন্দি জীবনের কারণে অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যারকে শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে পারছি না। এটা যে কতটা বেদনার। স্মৃতিকথাটি লিখছি আর স্যারের কথা মনে পড়ছে। ভাবছি এই মানুষটিকে আর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আসনে জীবিত দেখতে পাবো না ভাবতেই পারছি না। কিন্তু স্মৃতিতে অক্ষয় হয়ে স্যার বেঁচে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে। লেখাটি যখন লিখছি তখন আকাশ বেয়ে বৃষ্টি ঝরছে। হয়তো প্রকৃতি ও কাঁদছে স্যারের বিয়োগবেদনায়। আজ বারে বারে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বলাকা’ কবিতার কয়েকটি চরণ ভীষণ মনে পড়ছে-

                                           তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ

                                             তাই তব জীবনের রথ

                                  পশ্চাতে ফেলিয়া যায় কীর্তিরে তোমার বারম্বার’

অধ্যাপক ড.জামিলুর রেজা চৌধুরী সারের ৭১ এর স্মৃতিকথাটি মুক্তিযুদ্ধ : বুদ্ধিজীবীর দৃষ্টিকোণ ’ গ্রন্থ থেকে হুবহু সম্মানিত পাঠকবৃন্দের জন্য তুলে ধরছি। যে স্মৃতিকথাটি গ্রন্থের ৪২-৪৫ পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। এই লেখায় পাঠক খুঁজে পাবেন শ্রদ্ধাভাজন স্যারের মুক্তিযুদ্ধকালের ভূমিকা এবং অনেক অজানা তথ্য।

                                        সেই দিনগুলির কথা মনে পড়ে
                                          ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী

নুষের জীবনে কোন কোন সময় এমন কিছু স্মরণীয় ঘটনা থাকে যে ঘটনাগুলোকে কোনদিন ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। আমার এই জীবনে অনেক ঘটনাই ঘটেছে। কোনটা সুখের, কোনটা দুখের আবার কোনটা বেদনার। সে সকল ঘটনা থেকে যে বিষয়টি আমার অস্তিত্ব, অনুভূতি, হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে সেটি আর কিছু নয়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, যে যুদ্ধ বাংলাদেশের সমগ্র জাতিকে একত্রিত করেছিল। যে যুদ্ধ শিখিয়েছে কিভাবে অন্যায় অবিচারের যাতাকল থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন হওয়া যায়। যে যুদ্ধের ফলশ্রুতি স্বাধীন দেশ, যার নাম বাংলাদেশ।

               ১৯৭১-এ প্রত্যক্ষ কিছু অভিজ্ঞতা নিয়ে সাজিয়েছি আমার এই লেখাটি।

১৯৬৩ সনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যার নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি ১৯৬৪-১৯৬৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাষ্টার্স ও পি.এইচ.ডি গবেষক ছিলাম। তৎকালীন সময়ে যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তান স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন ছিল। ১৯৬৭ সালে এই এসোসিয়েশন-এর সভাপতি নির্বাচিত করা হয় আমাকে। আমরা সবাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলাম যে, আমাদের সভাগুলোতে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করবো। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানী ছাত্রদের একটি মনোভাব ছিল যে, পাকিন্তানী হলেই উর্দু জানতে হবে। তখন থেকেই আমাদের মধ্যে একটি বিভাজন তৈরি হয় এবং মনে হয় যে, পাকিস্তানীদের সাথে থাকা আমাদের জন্য দুরুহ হবে এবং এটিও মনে হতো যে, আমাদের একসাথে হয়তো বেশিদিন থাকতে পারবো না। অবশ্য ততদিনে পাকিস্তানীদের রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও তাদের মনোভাব ছিল যে, পাকিস্তানী হলেই উর্দু জানতে হবে।

১৯৬৮ সালে যখন আগরতলা যড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অভিযুক্ত করা হয় তখন আমরা এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে সরকারের এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে এই মিথ্যা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন জানানো হয়।

১৯৬৫ সালে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যে যুদ্ধ হয় তখন আমরা সবাই বুঝতে পারি যে, পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার জন্য কোন উদ্যোগই নেয়নি। যদিও প্রতিরক্ষা বাজেটের সিংহভাগ যোগান দিত পূর্ব পাকিস্তানের বসবাসরত জনগণ। আমি ১৯৬৮ সনে চার বছর পর করাচী বিমানবন্দরে নামার পরেই দেখলাম রাস্তায় আইয়ুব বিরোধী শ্লোগান দিয়ে অনেকগুলো মিছিল যাচ্ছে। আমার তখনই ধারণা হলো আইয়ুবের পতন আসন্ন।

১৯৬৮ সনে পূর্ব পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন করে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় যোগদান করি এবং সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করি। তখন বুয়েটের কোন শিক্ষক সমিতি ছিল না। ১৯৬৯-এর ফেব্রুয়ারি মাসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সামসুজ্জোহাকে সেনাবাহিনী কর্তৃক হত্যার প্রতিবাদে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ একটি প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ করেছিল। তখনই সিদ্ধান্ত হয় যে, একটি শিক্ষক সমিতি গঠন করতে হবে। ১৯৬৯ এর মার্চ মাসে ড. জহুরুল হক ও ড. আবুল হাসনাতের নেতৃত্বে বুয়েটে শিক্ষক সমিতি গঠিত হয়। অতঃপর প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার্স ক্লাব প্রতিষ্ঠার জন্য আবার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তাঁকে টিচার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।

১৯৭০ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমার ভোট দেয়া সম্ভব হয়নি। কেননা ১৯৭০ এর ১২ নভেম্বর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত মনপুরা দ্বীপে ৪-৫ জন শিক্ষক ও ২০-২৫ জন ছাত্র মনপুরায় ত্রাণ বিতরণের জন্য সেখানে অবস্থান করি এবং পুনর্বাসন পরিকল্পনার জন্য কিভাবে অল্প খরচে ঘর তৈরি করা যায়, সেজন্য পরিকল্পনা করি। মনপুরা দ্বীপে তাবু খাটিয়ে সেখানে অবস্থান করেছিলাম এবং রেডিওতে ৭০-এর নির্বাচনের ফলাফল শুনি।

আমরা জানতাম যে, আওয়ামী লীগ অনেক আসন পাবে কিন্তু ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি আসন পাবে এটা আমাদেরকে আশ্চর্যান্বিত করেছিল। বাংলার মানুষের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাবার আবেদনের উদাহরণ এই ১৯৭০ এর নির্বাচনের আওয়ামী লীগের বিশাল জয়। ১৯৭১-এর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ শোনার জন্য রমনার রেসকোর্স ময়দানে গিয়েছিলাম। একটি গুজব সেদিন ছড়িয়েছিল যে, এই জনসভায় আকাশ থেকে বোমা বর্ষিত হতে পারে। কেননা আমাদের মধ্যে তখন একটিই আবেদন আমরা সবাই এক হয়ে গেছি পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে। ৭ই মার্চ ভাষণের পর বেশির ভাগ নির্দেশনাই আসতো ধানমণ্ডি ৩২নং থেকে।

১৯৭১ এর ১৪ মার্চ আমার বন্ধু এক ফরাসী সাংবাদিকের সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য ধানম-ি ৩২নং এ যাই। ফরাসী সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করেছিলেন। এদিকে ঢাকায় শেখ মুজিব ইয়াহিয়া খানের মধ্যে আলোচনা চলতে থাকে। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চের বিকেলে একটি গুজব শোনা যায় যে, আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। সন্ধ্যার দিকে হয়তো পশ্চিম পাকিস্তানীরা আক্রমণ করতে পারে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপর। কিন্তু সে গুজব সত্যি হয়েছিল তবে শুধুমাত্র রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকেই তারা আক্রমণ করেনি।

আক্রমণ করেছে আপামর জনসাধারণ ছাত্র শিক্ষকদের উপর। চালিয়েছে অপারেশন সার্চলাইট। সেদিনের সেই ২৫ মার্চের রাতে বুয়েটের অনেক ছাত্র শহীদ হয়েছিল। ২৫ মার্চ থেকে কারফিউ জারি হয়। যে কারফিউ ২৬ মার্চ পর্যন্ত ছিল। ২৭ মার্চের দিকে একটি ঘোষণা আসে। যাদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র আছে সব জমা দেয়া হউক, আব্বার একটি দোনলা বন্দুক ছিল। সে বন্দুকটিও জমা দিয়েছিলাম।

তবে সে বন্দুকটি ফেরত দিয়েছিল। দোনলা বন্দুক ফেরত পাবার পর বন্দুক চালানো ও গুলি ছোড়া শিখেছিলাম।

আমাদের বাসার অর্থাৎ ৬৮ নং এলিফ্যান্ট রোডে আমাদের পরিবারের সকল সদস্য ও আত্মীয়স্বজনসহ মোট ৩০ জনের মতো স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমাদের বাড়ির নিচতলায় অবস্থান করছিলাম। আমাদের বাড়ির দোতলায় ভাড়া থাকতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক মাহমুদা ইসলাম, তারা তখন চলে গিয়েছিলেন আত্মীয়ের বাসায়। কিন্তু কাজের ছেলে ও কাজের মেয়েকে বাড়িতে রেখে যান। ১৪ ডিসেম্বর যখন এলিফ্যান্ট রোডের আশেপাশে ভারতীয়রা রকেট হামলা করছিল। তখন আমরা সবাই রকেট হামলার বিকট শব্দে ভয় পেয়েছিলাম। মাহমুদা ইসলামের দু’জন কাজের লোক তাদের বাড়ির সিঁড়ি ঘরে আশ্রয় নিয়েছিল। আর সেই সিঁড়িঘরের সাথে রাখা ছিল আমার ভাইয়ের একটি ফক্স্ ওয়াগেন গাড়ি। হঠাৎ ই-িয়ানদের রকেট তাঁদের বাড়ির দিকে আসে। সেই রকেটের হামলায় তাদের গাড়ির কিছু অংশ পুড়ে যায়। কিন্তু গাড়ির পেট্রোল বক্সে যদি রকেটটা পড়তো তাহলে পুরো বাড়িটা হয়তো পুড়ে যেত। তবে সেদিনের সিঁড়ি ঘরে আশ্রয় নেয়া কাজের লোক দু’জন মারা যায়। আমার এক চাচাত বোনের ছেলে কৌতুহলবশত বায়নোকুলার দিয়ে রকেট দেখার জন্য ছাদে ছিল। ছাদ থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় রকেটটি হামলা হলে তার সারা শরীরে রকেটের স্প্রিন্টার গেঁথে যায়।

রকেট হামলার পর পরই জাপানী সাংবাদিকরা আমাদের বাসার দিকে আসে এবং আমাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। আমিও সাক্ষাৎকার দিয়েছিলাম। স্বাধীনতার কয়েকদিন পর ভারতীয় বিমান বাহিনীর পাইলটরা বলেছিল যে তাদের গোয়েন্দা সূত্রের মাধ্যমে খবর পেয়েছিল এলিফ্যান্ট রোডের কোন এক বাসায় জেনারেল নিয়াজী আত্মগোপন করেছেন। সে জন্য তাকে ভয় দেখানোর জন্যই এই রকেট হামলা করেছিল ভারতীয় বাহিনী।

আসে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। আকাশে বাতাসে উড়তে থাকে একটি খবর দেশ স্বাধীন হবে। আর সত্যি সত্যিই ১৬ ডিসেম্বর পশ্চিম পাকিস্তানীরা আত্মসমর্পণ করে। পূর্ববাংলা সেদিন স্বাধীন হয়ে জন্ম নেয় বাংলাদেশের। আমার মা ১৬ ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হবার খবর শুনে চাউলের ড্রাম থেকে পতাকা বের করে আমাদের বাড়িতে টাঙ্গানোর নির্দেশ দেন। কেননা তখন পতাকা লাগানো নিষেধ ছিল। পতাকা লাগানোর অপরাধে আমাদের পাশের বাড়ির একজন ব্যক্তিকে গুলি করা হয়েছিল এবং সে গুলির আঘাতে মারা গিয়েছিল।

সেদিন বিষ্মিত হয়েছিলাম আমার মায়ের স্বাধীনতার সচেতনতার জন্য। বুয়েটের আহসানউল্লাহ হলে বসেই স্বাধীন দেশের পতাকার নকশা অংকন করা হয়েছিল। ১৭ ডিসেম্বর বুয়েটের প্রফেসর নুরুল উল্লাহ স্যার ড. ইকবাল মাহমুদকে দেখালেন বিস্ময়কর এক ভিডিও চিত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের উল্টোপাশে সিভিল ভবন থেকে ২৫ মার্চের রাতে ভিডিও টেপ রেকর্ডার দিয়ে সেদিনের জগন্নাথ হলে গণহত্যা ভিডিও করেন। আমরা অবাক হলাম গণহত্যার ভিডিওটি দেখে। দুঃখ পেলাম এই ভেবে যে, পশ্চিম পাকিস্তানীরা কি নির্মমভাবে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে পূর্ব পাকিস্তানীদের উপর। মনের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানীদের প্রতি যে, ঘৃণা ছিল, সে ঘৃণার মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হলো।

বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ, এ সম্ভাবনাময় দেশটির জন্য সবাই মিলে আমাদের এক হয়ে দাঁড়াতে হবে। কেননা, প্রাকৃতিক সম্পদ আর প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের এই দেশটিকে সমৃদ্ধ করে তোলার দায়িত্ব আমাদের সকলের। যে উদ্দেশ্যে আমরা ১৯৭১ এ সবাই এক হয়েছিলাম। সেই উদ্যম ধরে রেখে বাংলাদেশকে সুখী সমৃদ্ধ করতে হবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

রেদওয়ানুল/আওয়াজবিডি


mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ